মহেশখালীর পাহাড়ে শুক্রবার ভোর থেকে দুপুর অবধি পরিচালিত জেলা পুলিশের এক বড় ধরণের অভিযানে একটি বন্দুকের আস্তানার সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। এসময় পুলিশ ও পাহাড়ে বসতি গাড়া সন্ত্রাসীদের সাথে দীর্ঘ সময়জুড়ে চলা গুলি বিনিময়ের ঘটনায় বন্দুক তৈরির শীর্ষ কারিগর ছৈয়দুর রহমান ওরফে খুলুমিয়া ওরফে খুইল্ল্যা কাউন্টার ফায়ারে নিহত হয়। তার কাছ দু’শ পিচ ইয়াবা, একটি বন্দুক ও ১০ রাউন্ড গুলি পাওয়াগেছে। পরে পাহাড়ের ওই আস্তানায় অভিযান চালিয়ে খুইল্ল্যা বাহিনীর ফেলে যাওয়া বিপুল অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। কেরুণতলীর পাহাড়ে পরিচালিত এই অভিযানে জেলা পুলিশ সুপার ও মহেশখালী থানার ওসির নেতৃত্বে পুলিশের বড় দু’টি ইউনিট অংশগ্রহণ করেন। খুইল্ল্যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। একটি অস্ত্র মামলায় রয়েছে ৩০ বছরের কারাদণ্ড। গতকালের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আরও ৩টি মামলা করেছে পুলিশ।

পুলিশের বক্তব্য, যে ভাবে পরিচালিত হল অভিযানঃ

ঘটনার বিবরণ দিয়ে মহেশখালী থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ জানান পুলিশের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল হোয়ানকের কেরুণতলী পাহাড়ি এলাকায় স্থানীয় মাস্তানদের গ্রুপ কোদাইল্ল্যা বাহিনীর একটি আস্তানা রয়েছে। গতকাল ভোরে এই আস্তায় ১৫-২০ জন সন্ত্রাসী জড়ো হয়ে বেশী সংখ্যক বন্দুক ও গুলি নিয়ে একটি ক্রাইম অপারেশনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গোয়েন্দা সূত্রে এমন খবর নিশ্চিত হয়ে তার নেতৃত্বে মহেশখালী থানা পুলিশের একটি বড় দল রাতের আধার থাকতেই ভোর ৪ টার দিকে পাহাড়ের ওই এলাকায় অভিযানে যান। অভিযানে মহেশখালী থানার প্রায়সব অফিসার ও কনস্টবলসহ আনসার সদস্যরা অংশগ্রহণ করে। এসময় পুলিশ সন্ত্রাসীদের ওই আস্তানা কর্ডন করে রাখেন। একপর্যায়ে পুলিশ সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের জন্য সকাল ৮টার দিকে অভিযান শুরু করে। এসময় পুলিশের পুলিশের অভিযান মোকাবেলা করতে ও কর্ডন এরিয়া ভেঙ্গে সন্ত্রাসীরা এলাকা ত্যাগ করতে মরিয়া হয়ে উঠে। তারা পুলিশ সদস্যদের লক্ষ করে গুলি ছুটতে থাকে। পুলিশও পাহাড়ে কৌশলী অবস্থান নিয়ে সন্ত্রাসীদের লক্ষ করে পাল্টা গুলি ছুড়তে থাকে। দীর্ঘ সময় গুলিবিনিময় হওয়ার পর পুলিশ এক সময় সন্ত্রাসীদের কবলে পড়ে যায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মহেশখালী থানার পক্ষ থেকে সন্ত্রাসীদের মোকাবিলার জন্য জেলা পুলিশের সাহায্য চাওয়া হয়। পরে দ্রুত সময়ের মধ্যে বেলা ১০ টার দিকে কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে জেলা পুলিশের আরও একটি বড় ইউনিট অভিযানে যোগদান। ওই দলে আরও অতিরিক্ত ৫০ জন পুলিশ ছিল। পুলিশের এই দলটি আসার পর নতুন কৌশনে অভিযান শুরু হয়। সন্ত্রাসী-পুলিশের মধ্যে তুমুল গুলিবিনিময় হতে থাকে। এসময় পুলিশে যুগপৎ অভিযানে টিকতে না পেরে অস্ত্রও গোলাবারুদ ফেলে রেখে সন্ত্রাসী আস্তানা ত্যাগ করে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় ছৈয়দুর রহমানের দেহ। এসময় তার কোমরে ২শ পিচ ইয়াবা, বেল্টে ১০ রাউন্ড গুলি ও একটি শক্তিশালী ছোট কাটাবন্দুক পাওয়া যায়। আস্তানা থেকে মো. জাফর, আব্দুস সালাম, মো. ইসহাক, আব্দুল মালেকসহ অনেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় বলে ওসি জানান। এই ঘটনায় ৪ দারোগাসহ ৭ পুলিশ আহত হয়। পরে ওখান থেকে সন্ত্রাসীদের ফেলে যাওয়া বিপুল অস্ত্র ও গুলি সংগ্রহ করে নিয়ে আসে পুলিশ। এই ঘটনায় পুলিশ ১০০ রাউন্ডের উপরে গুলি বর্ষণ করেন। পুলিশ খুইল্ল্যার মরদেহ উদ্ধার করে ছুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করেন। তারপর প্রথমে মহেশখালী ও পরে জেলা হাসপাতালে ময়না তদন্তের জন্য পাঠান।

এসপির প্রেস ব্রিফিংঃ

দুপুরে অভিযান শেষ করে মহেশখালী থানার সামনে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গুলির প্রদর্শনী হয়। এসময় সাংবাদিকদের সামনে ঘটনার বিবরণ দেন কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার ড.একেএম ইকবাল হোসেন। তিনি ঘটনার উপরোক্ত একই বিবরণ দেন। তিনি জানান এসময় বিভিন্ন সাইজের ১৩টি বন্দুক ও ৩২ রাউন্ড তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। প্রেস ব্রিফিংকালে তার সাথে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আফরুজুল হক টুটুল উপস্থিত ছিলেন।

হাসপাতালে আহত ৭ পুলিশ ঃ

এই ঘটনায় ৭ পুলিশ আহত হয় বলে মহেশখালী থানা সূত্রে জানাগেছে। তাদেরকে মহেশখালী হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। মহেশখালী থানার জরুরী বিভাগ সূত্রে আহত পুলিশ সদস্যদের নাম পাওয়া যায়। তারা হলেন উপ-পরিদর্শক(এসআই) হারুণর রশিদ, সহকারী উপ-পরিদর্শক(এএসআই) সজ্জিত, মেহেদী হাসান ও শহিদুল ইসলাম। ৩ কনস্টবলের মধ্যে রয়েছে মিঠু ভৌমিক, রুবেল শর্মা ও সবিনয় চাকমা। পুলিশ আহত হওয়ার ঘটনায় আলাদা মামলাও হয় গত রাতে।

কে এই খুইল্ল্যাঃ

পুরোনাম ছৈয়দুর রহমান ওরফে খুলুমিয়া। এলাকায় খালেক মেম্বারের ভাই খুইল্ল্যা হিসেবেই পরিচিত। বড় মহেশখালীর মুন্সিরডেইল পাহাড়তলী এলাকার জনৈক মৃত আজম উল্লাহর পুত্র ছৈয়দুর রহমান একসময় শান্তশিষ্ট পান ব্যবসায়ী ছিল। পাহাড়ে ছিল তার একাধিক পানের বরজ। নব্বই দশকের শুরুর দিকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজচক্র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ওই সময় সেইসব বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এরিয়া ভিত্তিক সন্ত্রাসী গ্রুপ গুলোর মধ্যে কমদামী অস্ত্রের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়। বিএনপির ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত সেই সময়ের বড় মহেশখালী জনৈক ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আলোচিত অস্ত্র ব্যবসায়ীর হাত ধরে মহেশখালী থেকে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে অস্ত্র পাচার শুরু হয়। সে সময় পাহাড়ে পানের বরজের সাথে যুক্ত অনেক ব্যক্তিই অস্ত্র তৈরির কাজে জড়িয়ে পড়ে। প্রথম দিকে পাচারকারীরা কাঁচামাল সরবরাহ দিত আর কারিগররা বানাত বন্দুক। সেই দলে ভিড়ে যায় ছৈয়দুর রহমান ওরফে খুলুমিয়া। আর ফিরে আসতে পারেনি অন্ধকার জগত থেকে। একাধিক দফায় অস্ত্রসহ পুলিশ ও র‌্যাবের হাতে ধরা পড়ে। একের পর এক মামলার আসামি হতে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড়ে আত্মগোপনে থেকেই চলতে থাকে তার অস্ত্রের কারবার। গত শতকের ৯৩ সালের একটি মামলায় ২০০৬ তার বিরুদ্ধে ৩০ বছরের কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন আদালতে। ২০১৪ সালে র‌্যাবের হাতে বিপুল অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়। মহেশখালী থানায় রয়েছে আরও ডজনখানেক মামলা।

কোদাইল্ল্যা বাহিনীর সন্ত্রাসীরা বেপরোয়াঃ

গতকাল বেলা দু’টায় মহেশখালী থানায় ওসি প্রদীপ জানান অভিযান পরিচালনার সময় পুলিশ দেখে কোদাইল্ল্যা বাহিনীর সন্ত্রাসীরা বেশ বেপরোয়া হয়ে ওঠেছিল। এসময় অভিযান স্থলের আশপাশের এলাকা থেকেও পুলিশের অবস্থান লক্ষ করে গুলি বর্ষণ হয়। মহিলারাও এই কাজে এগিয়ে আসে। পুলিশ চলে আসার পরে ও এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালীন সময়েও ওই এলাকায় গুলি বর্ষণ হচ্ছে বলে ওসির কাছে খবর আসে।

 খুইল্ল্যার পরিবারের বক্তব্যঃ 

কাউন্টার ফায়ারে নিহত হওয়ার পর খুইল্ল্যার পরিবারের একাধিক সূত্রের সাথে আমরা কথা বলতে সক্ষম হয়েছি। তাদের দাবী লোকটা একসময় শান্তশিষ্ট ছিল। একটি অস্ত্র ব্যবসায়ীচক্র তাকে প্রথমেই অপরাধ জগতের সাথে যুক্ত করে। বিগত সময় তার বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো ষড়যন্ত্রমূলক বলেও দাবী করেন তারা। 

চৌকিদারাই বাঁচিয়ে রেখেছিল খুইল্ল্যাকেঃ 

মহেশখালীর প্রায়সব অপরাধের সাথে নানা ভাবে সরাসরি যুক্ত রয়েছে এলাকার ইউনিয়ন পরিষদগুলোর চৌকিদাররা।  বড় মহেশখালী ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার আলমগীর নিয়মিত এই খুইল্ল্যার আস্তানায় যাওয়াআসা করত। মাসিক চুক্তির ভিত্তিতে প্রশাসনের অভিযানের আগাম খবর। পুলিশের তৎপরতার খবর সরবরাহ করত এই চৌকিদার। গত কিছু দিন আগেও তার কাছে থেকে একটি আধুনিক মোবাইল সেট উপহার হিসেবে নিয়ছিল বলে সূত্রে প্রকাশ। 

সর্বশেষ খবরঃ

গতকাল রাত ১ টায় এই রিপোর্ট লেখার সময় সর্বশেষ খবরে জানাগেছে পুলিশ বাদী হয়ে ৩ মামলা করেছে। এইসব মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে ছৈয়দুর রহমান ওরফে খুলুমিয়া ওরফে খুইল্ল্যাকে। তাকে আটক দেখানো হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার লাশ কক্সবাজার হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। হত্যা, পুলিশের উপর হামলা ও অস্ত্র আইনে মহেশখালী থানার উপ-পরিদর্শক(এসআই) মিনহাজুল ইসলাম বাদী হয়েই এসব মামলা দায়ের করেন। এসব মামলায় ৫ জনের নাম উল্লেখ করে ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়। গভীর রাতে অন্যসব সন্ত্রাসীদের ধরতে আরও অভিযান পরিচালিত হয় বলে থানা সূত্রে জানাগেছে।

শেয়ার:

মন্তব্য দিন: