Advertisement


সোনাদিয়ায় পর্যটনের আড়ালে অবৈধ কটেজভিত্তিক অপরাধ বাড়ছে


রকিয়ত উল্লাহ।। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ সোনাদিয়া দ্বীপে পর্যটনের আড়ালে কটেজভিত্তিক অপরাধপ্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ঝাউবন উজাড় করে গড়ে ওঠা ডজনখানেক কটেজে হাত বাড়ালেই মিলছে ইয়াবা, মদ, নারীসহ নানা ধরনের মাদকদ্রব্য- এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সমুদ্রের বালিয়াড়িতে তাবুতে রাত্রিযাপনের নানা ‘প্যাকেজ সুবিধা’র আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা হলেও বাস্তবে এসব কটেজে পর্যটনের আড়ালে মাদক ও নারী ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ১ জানুয়ারি রাতে সোনাদিয়ার একটি কটেজ থেকে এক নারীকে অপহরণ করে জোরপূর্বক মদ্যপান করানো এবং ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ সামনে আসে। ভুক্তভোগী নারী লালমনিরহাট জেলার বাসিন্দা। তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশের সহায়তা কামনা করেন। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে স্থানীয় চৌকিদার, ইউপি সদস্য ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আকাশ ও হৃদয় নামে দুই যুবককে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান এক ইউপি সদস্য।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ৩১ ডিসেম্বর পর্যটক পরিচয়ে তিন যুবক লালমনিরহাট সদরের আহসানুল হোসাইনের মেয়ে ফাইরোজ (ছদ্মনাম) নামে ওই নারীকে নিয়ে সোনাদিয়ার রাকিবের মালিকানাধীন ‘ক্যাম্পফায়ার’ নামের একটি কটেজে ওঠেন। অভিযুক্ত তিন যুবকের নাম সামি, আকাশ ও হৃদয়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে রাতভর ইয়াবা ও মদ সেবনের পাশাপাশি ওই নারীকে যৌন নিপীড়নের শিকার করা হয়।

১ জানুয়ারি নারীটি কটেজ ত্যাগ করতে চাইলে তাকে জোরপূর্বক আটকে রাখা হয় এবং পুনরায় মদ্যপান করিয়ে যৌন নিপীড়নের চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে তিনি পরিবার ও পুলিশের সহায়তা চান। পরে পুলিশ স্থানীয় ইউপি সদস্য, চৌকিদার ও এলাকাবাসীর সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে। এ সময় কক্সবাজার সদরের লাইটহাউজ এলাকার আবদু ছফুরের ছেলে মো. হৃদয় (২০) এবং হোয়ানক পানিরছড়া এলাকার আবদুস সালামের ছেলে মো. আকতার হামিদ আকাশ (২২) কে আটক করা হয়। বড় মহেশখালীর শরীফ বাদশার ছেলে সামি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছে সূত্র।

সোনাদিয়ায় রাত্রিযাপন করতে আসা কয়েকজন স্থানীয় পর্যটক অভিযোগ করে বলেন, “সোনাদিয়ার কটেজে যা চাইবেন তাই পাওয়া যায়- নারী, ইয়াবা, মদ। কটেজ পরিচালকেরাই এসবের ব্যবস্থা করে দেয়। পর্যটনের নামে এখানে মূলত মাদক ও নারী ব্যবসা চলছে। নেই কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আজ একটি মেয়ের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা নতুন নয়। এখানে এমন ঘটনা নিয়মিত ঘটে, কিন্তু বেশিরভাগই চাপা পড়ে যায়। প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ ঘটনা ঘটবে।”

এদিকে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, সোনাদিয়া দ্বীপে ঝাউবন উজাড় করে সরকারি জমি দখলের মাধ্যমে গড়ে ওঠা কটেজগুলো অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব কটেজে নেই কোনো নিবন্ধন, নজরদারি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা। স্বামী–স্ত্রী না হলেও কোনো যাচাই-বাছাই ও পর্যটক আসাযাওয়ার রেজিস্টার ছাড়াই যুগল হিসেবে একসঙ্গে রাত্রিযাপনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে দ্বীপটি ক্রমেই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নীরবতা ও কার্যকর তদারকির অভাবে এসব কটেজে প্রকাশ্যে মাদক সেবন, অসামাজিক কার্যকলাপ এবং নারীদের চরম নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর ফলে একদিকে দ্বীপের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটছে, অন্যদিকে পর্যটনের নামে সোনাদিয়ার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও সুনাম মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। দ্রুত কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

এ বিষয়ে মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুজিবুর রহমান বলেন, “সোনাদিয়ার ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং দুইজনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।”