উপজেলা থেকে জাতীয় মঞ্চে কক্সবাজারের মেয়ে সুবাইতা, প্রধানমন্ত্রীর সামনে বলল স্বপ্নের কথা

নিজস্ব প্রতিবেদক◾স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল উপজেলা পর্যায় থেকে। এরপর মেধা আর অদম্য উদ্ভাবনী শক্তির জোরে একে একে জেলা পর্যায়ের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় বিজ্ঞান মঞ্চে জায়গা করে নেয় তাঁর দল। নিজস্ব আত্মবিশ্বাস, প্রখর বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও অসাধারণ উপস্থাপন শৈলী দিয়ে এবার পুরো দেশের সামনে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের মেধার সুবাস ছড়িয়ে দিল রামু ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের কৃতি শিক্ষার্থী সুবাইতা বিনতে শহীদ।

গত ২৯ জুন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘এডুকেশনাল এক্সিলেন্স সাপোর্ট স্কিম’ (ইইএসএস)-এর আওতায় অত্যন্ত জমকালোভাবে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় "Startup, Science Project and Innovation Idea Showcasing" প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা ৮ হাজারেরও বেশি প্রতিযোগীর মধ্য থেকে কঠোর যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচিত শীর্ষ ১০১টি দল এই মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় আসরে নিজেদের উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শনের সুযোগ পায়।

কক্সবাজার জেলার প্রতিনিধিত্বকারী দলটির অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি বা ‘খুদে বিজ্ঞানী’ হিসেবে সুবাইতা বিনতে শহীদ জাতীয় এই বিশ্বমঞ্চে তাদের বিশেষ উদ্ভাবনী প্রজেক্টটি নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করেন। শুধু বিজ্ঞান প্রজেক্ট উপস্থাপনই নয়, অসাধারণ বাচনভঙ্গি, চমৎকার প্রক্ষেপণ ও নেতৃত্বের অসাধারণ গুণের কারণে দেশজুড়ে আগত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে মূল মঞ্চে দাঁড়িয়ে সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার এক বিরল ও গৌরবময় সুযোগ লাভ করেন এই সাগরকন্যা।

কক্সবাজারের বায়তুশ শরফের বার্মিজ মার্কেট এলাকার স্থানীয় এই স্থায়ী বাসিন্দা তাঁর মেধার দ্যুতিতে পুরো জেলাকে ভাসিয়েছেন গৌরবে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, শিক্ষা উপদেষ্টা, মন্ত্রণালয়ের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাবৃন্দ, পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দের পিনপতন নীরবতার মাঝে সুবাইতার সাবলীল ও পরিমিত প্রক্ষেপণ উপস্থিত সবার ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। 

অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচারের কল্যাণে পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চেতা বক্তব্য দেওয়ার দৃশ্যটি দেখে সমগ্র কক্সবাজারবাসী প্রীত ও পুলকিত হয়েছেন। তাঁর পরিমিত শব্দচয়ন ও মনোমুগ্ধকর অভিব্যক্তি নতুন প্রজন্মের উদ্ভাবনী ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে, যা উপস্থিত সুধীজনসহ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর হৃদয় জয় করে নেয়।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলের একজন গর্বিত শিক্ষার্থী হিসেবে সুবাইতা প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও আবেগঘন শুভেচ্ছা বার্তা তুলে ধরেন। সেই শুভেচ্ছা পত্রে সে উল্লেখ করে- "মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার এই উদ্যোগ আমাদের সৃজনশীল, গবেষণামনস্ক, ভবিষ্যতের উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহিত করবে। ...আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে আমাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতাকে দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলব। আজ আমাদের শপথ হোক একটাই- যোগ্য হয়ে, গড়বো দেশ-সবার আগে বাংলাদেশ।"

জাতীয় বিজ্ঞান মঞ্চে এমন অভাবনীয় ও গৌরবোজ্জ্বল সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সুবাইতা বিনতে শহীদকে সম্মানজনক "উদ্ভাবনী মেধাবী শিক্ষার্থী" সনদ প্রদান করা হয়।

রামু ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের খুদে বিজ্ঞানীদের উপস্থাপিত এই যুগান্তকারী নতুন উদ্যোগ বা স্টার্টআপটির নাম ‘রূপান্তর’, যা মূলত ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতির একটি আধুনিক মডেল। এটি ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি-ভিত্তিক স্মার্ট বর্জ্য পৃথকীকরণ প্রযুক্তি, সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশবান্ধব পরিবেশগত-বাজার ব্যবস্থা বা ইকো-মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে দেশের প্রচলিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার একটি সমন্বিত ও টেকসই ওয়ান-স্টপ বা একক সমাধান প্রদান করে। উদ্ভাবনী এই প্রজেক্টটি পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি ১১ (টেকসই নগর ও জনপদ), ১২ (পরিমিত ভোগ ও টেকসই উৎপাদন) এবং ১৩ (জলবায়ু কার্যক্রম)-এর লক্ষ্য অর্জনে সরাসরি সামঞ্জস্য বজায় রাখে।

সূত্র বলছে, সুবাইতা বিনতে শহীদের এই প্রতিভা হুট করে বিকশিত হয়নি। সে মূলত বাংলাদেশ বেতার কক্সবাজার কেন্দ্রের একজন নিয়মিত তালিকাভুক্ত উপস্থাপক, আবৃত্তি ও নাট্য শিল্পী। তার পিতা মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং বাংলাদেশ বেতার কক্সবাজার কেন্দ্রের একজন জনপ্রিয় ঘোষক ও প্রথিতযশা উপস্থাপক। অন্যদিকে তার মা শরমিন সিদ্দিকা লিমা একজন গবেষক, সহযোগী অধ্যাপক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজকর্মী। মূলত পারিবারিক সাংস্কৃতিক ও মননশীল আবহের কারণেই সুবাইতার মাঝে এই অসাধারণ বাচনভঙ্গি ও বাচনিক প্রক্ষেপণ তৈরি হয়েছে, যা শিক্ষা জীবনেও তাকে ধারাবাহিক কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সহায়তা করেছে।

শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জগতেই নয়, সুবাইতা বিনতে শহীদ তাঁর অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতিটি ক্ষেত্রেও। সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিতর্ক ও ক্রীড়াঙ্গনে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখে এ পর্যন্ত তিনি অর্জন করেছেন অসংখ্য মেডেল, সম্মাননা স্মারক, ক্রেস্ট ও প্রশংসাপত্র। বিশেষ করে জাতীয় পর্যায়ের বিতর্ক প্রতিযোগিতায় একজন ক্ষুরধার তার্কিক হিসেবে অংশগ্রহণ করে তিনি কুড়িয়েছেন ব্যাপক প্রশংসা ও দেশজোড়া সুনাম। মেধার বহুমাত্রিক বিকাশে সুবাইতা আজ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সুবাইতার এই গৌরবময় অর্জনকে ঘিরে ব্যাপক প্রশংসা ও আনন্দের জোয়ার বইছে। কক্সবাজারের জেলা শিক্ষা অফিসারসহ বহু গুণীজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী সুবাইতার এই প্রক্ষেপণ ও মিষ্টি উপস্থাপনাকে অভিনন্দন জানিয়ে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেছেন। সুবাইতার এই অনন্য অর্জন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য নয়; এটি মূলত পুরো কক্সবাজারের তরুণ প্রজন্মের অফুরন্ত সম্ভাবনার এক জীবন্ত দলিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সুবাইতার এই গৌরবোজ্জ্বল কৃতি প্রসঙ্গে কক্সবাজার জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা জানান, "স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট,ইনোভেশন আইডিয়া শোকেজিং জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে রামু ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্রী সুবাইতা বিনতে শহীদ বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছে। সারা দেশের ১০ জন শিক্ষার্থী অনুভূতি প্রকাশের জন্য সুযোগ পায়,তন্মধ্যে কক্সবাজারের সাগর কন্যা সুবাইতা অন্যতম।সে তার বক্তব্যে যোগ্য উদ্ভানী হয়ে গড়ে উঠে নিজেকে গড়ে দেশকে গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে।কক্সবাজার শিক্ষা পরিবারের পক্ষ থেকে তার অনন্য অবদানের জন্য অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।"

কক্সবাজারের শিক্ষা সচেতন লোকজনের অভিমত, মফস্বলের একটি সাধারণ উপজেলা থেকে মেধার জোরে দেশের সর্বোচ্চ জাতীয় মঞ্চে এবং দেশের সরকার প্রধানের সামনে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে সুবাইতা প্রমাণ করেছে যে, অদম্য ইচ্ছা আর সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সমুদ্রপাড়ের সন্তানরাও দেশ জয়ের নেতৃত্ব দিতে পারে। রামু তথা সমগ্র কক্সবাজারবাসীর এখন একটাই প্রত্যাশা- সুবাইতার এই স্বপ্নের উড়ান আগামী দিনে দেশের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণার খাতকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার ও বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ার এক পরম প্রেরণা জোগাবে।