মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু: সরজমিনে উচ্চপর্যায়ের দল


মাহবুব রোকন ও ফারুক ইকবাল।। মহেশখালী-কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও স্বপ্নের ‘মহেশখালী-কক্সবাজার সেতু’ নির্মাণ প্রকল্প এখন আর কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন দৃশ্যমান বাস্তবতার পথে ধাবিত হচ্ছে। কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের শক্তিশালী ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) এবং সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সক্রিয় তৎপরতায় এই মেগা প্রকল্পের কাজ নতুন গতি পেয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সেতু বিভাগের সচিব ও বিশেষজ্ঞ দলের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা মাঠ পর্যায়ে এলাইনমেন্ট পরিদর্শন ও অংশীজনদের সাথে মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়েছেন। ৬ লক্ষাধিক মানুষের প্রাণের দাবি এই সেতুটি নির্মিত হলে দ্বীপ জনপদের সাথে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হবে।

গতকাল সকালে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নানের সভাপতিত্বে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেতু বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ। সভায় সচিব স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বর্তমান সরকারের আমলেই এই সেতুর কাজ দ্রুততম সময়ে শুরু হবে। তিনি উল্লেখ করেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকল্পটির তেমন অগ্রগতি না হলেও নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একে ‘অগ্রাধিকার প্রকল্প’ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

সভায় জানানো হয়, প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা সম্ভাব্য ব্যয়ে ৬ বছর মেয়াদী এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রাক-সমীক্ষা বা প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডির আলোকে ৪টি সম্ভাব্য এলাইনমেন্ট (স্থান) নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। এর মধ্যে মহেশখালী পৌরসভার জেটি ঘাট সংলগ্ন প্রান্ত থেকে কক্সবাজার সদরের খুরস্কুল ইউনিয়ন পর্যন্ত সংযোগস্থলটিকে যাতায়াত ও কৌশলগত দিক থেকে ‘সবচেয়ে সুবিধাজনক’ হিসেবে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সচিব জানান, এখন থেকে পূর্ণাঙ্গ ফিজিবিলিটি স্টাডি ও ডিটেইল ডিজাইনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে।

মতবিনিময় সভা শেষে বিকেলের দিকে সেতু সচিবের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ দলটি মহেশখালীতে প্রস্তাবিত এলাইনমেন্ট সরজমিনে পরিদর্শন করেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ, মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইমরান মাহমুদ ডালিম, সেতু মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার আবুল হোসাইন, কর্ণফুলী টানেল সাইট অফিসের সহকারী প্রকৌশলী (ইএমই) মো. সিকান্দার ইব্রাহিমসহ কারিগরি টিমের সদস্যবৃন্দ। প্রতিনিধি দলটি প্রস্তাবিত সেতুর ভৌগোলিক উপযোগিতা, ভূমির গুণাগুণ এবং কারিগরি চ্যালেঞ্জগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

সভায় জেলা পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইমরান হোসাইন সজিব, কক্সবাজার সদর সার্কেলের এএসপি মাহমুদুল হাসান, কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী, জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ বদরী এবং বিআইডব্লিউটিএর পোর্ট অফিসার মো. আব্দুল ওয়াকিল। 

এছাড়াও বিআইডব্লিউটিএর পরিবহণ পরিদর্শক মো. জসিম উদ্দিন, এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী সাফাওয়াত ফারুক চৌধুরী, পিডিবির সহকারী প্রকৌশলী বাবুল মিয়া, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী অহিদুল ইসলাম, সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উদ্দিন খালেদ চৌধুরী, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ চৌধুরী, পরিবেশ অধিদপ্তরের আব্দুস সালাম, মহেশখালী প্রেস ক্লাব সভাপতি জয়নাল আবেদীন, সাবেক সভাপতি আবুল বশর পারভেজ, যুবদল নেতা ইমতিয়াজ হাসান, হারুন উদ্দিন রুবেল, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, ওয়াজেদ মনিসহ অন্যরা সভায় অংশ নেন।

জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলায় এমপি আলমগীর ফরিদ সভায় সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারলেও তাঁর পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল সভায় অংশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করেন। এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন- মহেশখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক চেয়ারম্যান রুহুল কাদের বাবুল, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাস্টার আব্দুল মান্নান, আইনজীবী এডভোকেট হামিদুল হক ও এডভোকেট সিরাজুল হক রানা, মহেশখালী উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আনচার উল্লাহ বিএ এবং মহেশখালী উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক তারেক রহমান জুয়েল।

সভায় সেতুর দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে জেলা পরিষদ প্রশাসক এটিএম নুরুল বশর চৌধুরী বলেন, এটি এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-মরণের সাথে মিশে থাকা এক দাবি। যুগ যুগ ধরে দ্বীপের মানুষ অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে আসছে। তাই আমরা আর কোনো কালক্ষেপণ দেখতে চাই না। যাবতীয় প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে বর্তমান সরকারের আমলেই এই সেতুর দৃশ্যমান নির্মাণ কাজ শুরু করতে হবে।

নকশা ও কৌশলগত দিক নিয়ে কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, চ্যানেলের যে অংশে দূরত্ব সবচেয়ে কম, সেখানেই সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা উচিত। বিশেষ করে সেতুর মাধ্যমে বিমানবন্দর সংলগ্ন পয়েন্টের সাথে মহেশখালীর সংযোগ স্থাপন করা গেলে যাতায়াতের দূরত্ব ও ব্যয় নজিরবিহীনভাবে কমে আসবে, যা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

সভা শেষে এক প্রতিক্রিয়ায় উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক তারেক রহমান জুয়েল বলেন, এই সেতু আমাদের প্রজন্মের জন্য শুধু একটি স্বপ্ন নয়, এটি আমাদের জীবনের নিরাপত্তা। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ে আমাদের ভাই-বোনেরা আর প্রাণ হারাবে না, এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।

এদিকে পরিদর্শনকালে সাথে থাকা মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা কারিগরি দলকে সব ধরণের প্রশাসনিক ও স্থানীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছি। সেতুটি নির্মিত হলে মহেশখালীর পর্যটন ও শিল্প খাতের চেহারা আমূল বদলে যাবে। সার্বিক বিবেচনায় এবার দ্রুততম সময়ে সেতুর কাজ শুরু হবে বলে আমরা আশাবাদী।

সংসদ অধিবেশন শেষে ঢাকা থেকে মুঠোফোনে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ বলেন, মহেশখালী এখন দেশের সুনীল অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এই অবহেলিত জনপদের মানুষকে মান্ধাতা আমলের ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ থেকে মুক্তি দেওয়া আমার নির্বাচনী শপথ ছিল। কক্সবাজারের কৃতি সন্তান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের অনুপ্রেরণা ও প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক ইচ্ছায় আমরা ইনশাআল্লাহ এই সেতু নির্মাণ করে এক অনন্য ইতিহাস গড়ব।

প্রকল্পটির বর্তমান গতির মূলে রয়েছে সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের বলিষ্ঠ প্রশাসনিক অবস্থান। গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তিনি এই প্রকল্পটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২ এপ্রিল তিনি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী বরাবর একটি শক্তিশালী ও তথ্যবহুল ডিও লেটার প্রদান করেন। পত্রে তিনি মহেশখালীকে দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ হিসেবে উল্লেখ করে এর বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং মাতারবাড়ী মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য প্রস্তাবিত সেতুর অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। এমপি ফরিদের এই আবেদনের গুরুত্ব বিবেচনা করে মন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে নথিতে সেতু সচিবকে ‘জরুরি ভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ’ করতে লিখিত নির্দেশনা প্রদান করেন। মূলত এই একটি প্রশাসনিক চিঠিই ঝুলে থাকা প্রকল্পটিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে বের করে সরাসরি মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শনে নিয়ে এসেছে।

অভিজ্ঞরা মনে করছেন, মহেশখালীতে চলমান মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং এলএনজি টার্মিনালের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ সুফল ঘরে তুলতে এই সেতুটি হবে এক অনিবার্য লাইফলাইন। দীর্ঘদিনের ঝুঁকি আর বঞ্চনা পেরিয়ে ৫ লক্ষাধিক দ্বীপবাসীর জন্য একটি স্থায়ী সড়ক সংযোগ এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। উচ্চপর্যায়ের এই সফর ও সচিবের জোরালো আশ্বাসে মহেশখালীবাসীর মনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। তারা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে-কবে পড়বে স্বপ্নের সেতুর সেই ভিত্তিপ্রস্তর।