একদিকে চেয়ারম্যানের দাবি- মেম্বাররা পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে শপথ নিয়ে জোট বেঁধে টাকা আত্মসাৎ করছেন; অন্যদিকে ফাঁসের মুখে পড়া এক অডিও রেকর্ডে খোদ চেয়ারম্যানের অর্থ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এবং বাড়ি থেকে তুলে এনে পেটানোর হুমকির তথ্য উঠে এসেছে।
একই সাথে সরকারের অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি প্লাস) টাকাও লোপাট করার গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মূলত নিজেদের ক্ষমতা ও সরকারি অর্থ লুটপাটের সুবর্ণ সুযোগ দীর্ঘায়িত করতেই আইনি মারপ্যাঁচে নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখা শাপলাপুরের ইউপি চেয়ারম্যানের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শাপলাপুর ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ গত ১২ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের সংশোধিত ইউনিয়ন পরিষদ আইন অনুযায়ী এ পরিষদে মহেশখালী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে 'প্রশাসক' নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠান তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। কিন্তু উক্ত সরকারি প্রস্তাবকে সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদের পরিপন্থী দাবি করে মহামান্য হাইকোর্টে একটি রিট মামলা দায়ের করেন ইউপি চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুল খালেক চৌধুরী।
এর প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সরকারি ওই আদেশ স্থগিত করলে আব্দুল খালেকের চেয়ারম্যান পদ বহাল থাকে। তবে নির্বাচন না হওয়া এবং মেম্বারদের আইনগত অবস্থান অস্পষ্ট থাকার সুযোগে এলাকায় এক ধরনের প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এরইমধ্যে চেয়ারম্যানের নির্দেশে মেম্বারদের পদশূন্য দাবি করে এলাকায় মাইকিং করার পর থেকেই মূলত সংঘাতের সূত্রপাত।
সম্প্রতি প্যানেল চেয়ারম্যান-১ ফরিদুল আলমের সাথে চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক চৌধুরীর একটি ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁসের পর এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
ফোনালাপে দেখা যায়, চেয়ারম্যানের মামলার অজুহাত দিয়ে বিগত দুই বছর ধরে মেম্বাররা বিপুল পরিমাণ সরকারি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ তোলেন চেয়ারম্যান খালেক চৌধুরী। তিনি এই টাকা যেকোনো মূল্যে উসুল করা হবে বলে জানান। জবাবে প্যানেল চেয়ারম্যান ফরিদুল আলম দাবি করেন, মামলার খরচ ও পদ বহাল রাখার কথা বলে মেম্বারদের মাসিক সম্মানি থেকে ৫০ হাজার টাকা করে কেটে নিয়েছেন খোদ চেয়ারম্যান। এমনকি কক্সবাজারের বাড়িতে ডেকে এনে প্রতি মেম্বার থেকে আরও ২০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়েছে।
এদিকে মেম্বারের মুখে এই পাল্টা অভিযোগ শুনে চরম ক্ষিপ্ত হন চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক। তিনি তাৎক্ষণিক অভিযোগ অস্বীকার করে মেম্বারকে 'বাড়ি থেকে তুলে এনে মারা হবে' বলে সরাসরি হুমকি দেন।
এদিকে গত ৬ জুন ২০২৬ তারিখে এক লিখিত বিবৃতিতে চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক চৌধুরী তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে মেম্বারদের দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি দাবি করেন, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে তাঁর প্রতিপক্ষরা তাঁকে ২-৩টি রাজনৈতিক মামলায় আসামি করে কোণঠাসা করেছে। এই সুযোগে পরিষদের মেম্বাররা নিজেরা লিখিত চুক্তি করে এবং পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে শপথ নিয়ে জোটবদ্ধ হয়েছেন।
চেয়ারম্যানের অভিযোগ, "আমার অনুপস্থিতির সুযোগে মেম্বাররা সমস্ত সরকারি বরাদ্দ কুক্ষিগত করে প্যানেল চেয়ারম্যান ফরিদের স্বাক্ষরে আত্মসাৎ করছেন। আইনত চেয়ারম্যান সক্রিয় থাকলে প্যানেল চেয়ারম্যানের আর্থিক ক্ষমতা পাওয়ার সুযোগ নেই। তথাপি মেজরিটির জোরে অফিসকে বশীভূত করে তারা এই বেআইনি কাজ করছে।" এই বিষয়ে প্রশাসনকে আইনি নোটিশ দিয়ে শাপলাপুরের যাবতীয় বরাদ্দ বন্ধের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন চেয়ারম্যান।
তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের এক ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করে ক্যাপশনে খোদ চেয়ারম্যান নিজেই একটি বিস্ফোরক তথ্য স্বীকার করেছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি টাকা লোপাটের অংশ থেকে মেম্বাররা তাঁকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন এবং সেই টাকা তিনি এক জায়গায় নিরাপদ হেফাজতে জমা রেখেছেন।
চেয়ারম্যানের এমন আত্মস্বীকৃতির পর স্থানীয় সচেতন মহলের কাছে পুরো বিষয়টি পানির মতো পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। তাদের মতে, মামলার কারণে চেয়ারম্যান নিজে এলাকা থেকে পলাতক বা দূরে থাকার কারণে মেম্বাররা এককভাবে সরকারি টাকা লুটপাটে মেতে উঠেছেন। আর মেম্বারদের এই একক কর্তৃত্বে চেয়ারম্যান নিজের ভাগের অংশ বা সমান সুবিধা সময়মতো না পাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়েই মূলত এখন মেম্বারদের বিরুদ্ধে মাঠে লেগেছেন।
চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের এই কামড়াকামড়ির সমান্তরালে মাঠ পর্যায়ে চলছে সাধারণ মানুষের হক চুরির উৎসব। অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি ‘ইজিপিপি প্লাস’ (EGPP+) প্রকল্পের অর্থ সরাসরি লুটের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, শাপলাপুরে ৩২ দিনের এই প্রকল্পে প্রায় ৭০০ জন প্রকৃত হতদরিদ্র শ্রমিকের জন্য দৈনিক ৬০০ টাকা হারে মজুরি বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে উল্টো। মেম্বাররা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, বিত্তশালী এবং এমনকি কর্মরত গ্রাম পুলিশদের স্ত্রী ও সন্তানদের নাম তালিকায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই অনৈতিক ভাগবাটোয়ারা নিশ্চিত করতে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিস সহকারী ফরহাদ এবং উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী বাহাউদ্দিন মজুমদার। ওই বৈঠকে একাধিক ইউপি সদস্য উপস্থিত থেকে প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে অর্থ ভাগ করার ‘অশুভ আঁতাত’ করেন।
পরিষদের সাধারণ বঞ্চিত মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা পেটের দায়ে কাজ খুঁজি, আমাদের নাম তালিকায় নেই। মেম্বাররা বিত্তশালীদের নাম দিয়ে টাকা তুলছে।" এই জاলিয়াতির পেছনে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও সৌভ্রাত দাশ) রহস্যজনক ভূমিকা ও পরোক্ষ প্রশ্রয় রয়েছে বলেও সচেতন মহল অভিযোগ তুলেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, "সরকারের দরিদ্রবান্ধব এই কর্মসূচিতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। শাপলাপুরের ইজিপিপি প্লাস প্রকল্পের অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তালিকায় স্বজনপ্রীতি বা অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িত কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধি- কারো ছাড় মিলবে না।"
আইনি মারপ্যাঁচে নির্বাচন ঝুলিয়ে রেখে একটি জনগুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন পরিষদকে বছরের পর বছর দুর্নীতির চারণভূমি বানানোর এই ক্ষতিকর প্রবণতা মহেশখালীর সুশীল সমাজকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। একদিকে পলাতক বা কোণঠাসা চেয়ারম্যান, অন্যদিকে মেম্বারদের সিন্ডিকেট- সব মিলিয়ে শাপলাপুরের সাধারণ মানুষ এখন জিম্মি।
সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে এই পরিষদের ফরেনসিক অডিট সম্পন্ন করে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হোক, যাতে শাপলাপুর ইউনিয়ন পরিষদ দীর্ঘদিনের এই প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাট থেকে মুক্তি পেয়ে তার হারানো গৌরব ফিরে পায়।
