তদন্তাধীন একটি বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদ সম্মেলনে নেতাদের বিরুদ্ধে যে 'মদ্যপানের প্রস্তাব' বা ‘মদ্যপ অবস্থা’র অভিযোগ তোলা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ কাল্পনিক দাবি করে বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসাধনের অপচেষ্টা বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটির চট্টগ্রামের আঞ্চলিক শাখা।
আসল বিলে কী ছিল? মিলল না মদ্যপানের প্রমাণ
হাতে আসা দ্য পেনিনসুলা-চট্টগ্রাম (The Peninsula-Chittagong)-এর ওজোন বার ও লাউঞ্জ (Ozone Bar & Lounge)-এর কম্পিউটারাইজড ক্যাশ মেমো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই রাতে এনসিপি নেতৃবৃন্দ কোনো প্রকার অ্যালকোহল বা মদ জাতীয় পানীয় অর্ডার করেননি।
সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ জুন ২০২৬ তারিখে রাত ৮টা ১৪ মিনিটে ৪ জন অতিথির (PAX# 4) জন্য খাবারগুলো পরিবেশন করা হয়েছিল।
![]() |
খাবারের আইটেম: মটন পায়া স্যুপ ৪ বাটি (১৯৬০ টাকা), গার্লিক নান ৪টি (৬৮০ টাকা), চিকেন প্রন ২টি (২০০০ টাকা)। পানীয়: বেনানা স্মুদি ১টি (৩৫৬ টাকা), কোক ক্লাসিক ১টি (৩৫০ টাকা), মিনারেল ওয়াটার ১টি (৬৭.১৯ টাকা) এবং কফি ৪ কাপ (৭৯০.৫২ টাকা)। বেনসন অ্যান্ড হেজেস সিগারেট ১টি (৩৭০ টাকা)।
খাবারের মূল বিল এসেছিল ৬,৫৭৩.৭১ টাকা, যার সাথে ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হয়ে সর্বমোট ৮,৩১৬.০০ টাকা পরিশোধ করা হয়।
বিল ও ধূমপান প্রসঙ্গে মুখ খুললেন সুজাউদ্দিন
হোটেলের খাবারের বিল কে বা কারা পরিশোধ করেছেন এবং সেখানে কী ঘটেছিল, সে প্রসঙ্গে এ এস এম সুজাউদ্দিন তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে মহেশখালীর সব খবরকে বলেন- “আমরা সবাই মিলে খাবারের অর্ডার করেছিলাম। সাধারণত এ ধরনের আড্ডা বা অনুষ্ঠানে যে যার অংশের বিল পরিশোধ করে থাকে বাইরে, তবে সেদিন এলাকার একজন সিনিয়র বড় ভাই পুরো বিল পরিশোধ করেন এবং বলেন, ‘অন্যদিন তোমরা দিও।’ ব্যক্তিগতভাবে আমি কোথাও গেলে বা কোনো পরিচিতজন দাওয়াত দিলেও সৌজন্যবোধের জায়গা থেকে প্রায়ই বিল পরিশোধ করার চেষ্টা করি কিংবা অন্তত জিজ্ঞাসা করি, ‘Can I contribute?’ সেদিন বিলটি ওই বড় ভাইরা পরিশোধ করেছিলেন।”
অভিযোগকারীর মদ্যপানের দাবির বিপরীতে সুজাউদ্দিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন- “উপস্থিত বড় ভাইরা মাঝে মাঝে ধূমপান করেন এবং সেটিও তিনি অনুমতি নিয়েই করেন। অথচ অভিযোগকারী দাবি করেছেন যে আমরা নাকি মদ্যপানের প্রস্তাব দিয়েছি? আমাদেরকে মদ্যপ অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন? বিষয়টি কতটা সত্য বা যুক্তিসঙ্গত, দরকার হলে সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ, সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখতে পারেন। বাকিটা বিবেকবান মানুষের বিচার ও সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিলাম।”
আগের ঘটনা ও দলীয় কোন্দলের সূত্রপাত
এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল যখন সানজিদা সুলতানা ইভা নামের এক নারী নিজেকে এনসিপির কর্মী দাবি করে গত ১৭ জুন চট্টগ্রামের চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন এবং ১৯ জুন সংবাদ সম্মেলন করে সাদিয়া আফরিন ও সুজাউদ্দিনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন।
এর জবাবে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক রিদুয়ান হৃদয় এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক আখ্যা দেন এবং এর পেছনে 'হুজ্জাতুল ইসলাম সাইদ' নামের এক ব্যক্তির ইন্ধন রয়েছে বলে দাবি করেন।
তবে তদন্তাধীন এই বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির প্যাডে সরাসরি পক্ষাবলম্বন করে প্রেস রিলিজ দেওয়াকে দলীয় শৃঙ্খলার পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করেছে কেন্দ্র। এর প্রেক্ষিতে ২০ জুন কেন্দ্রীয় দপ্তর সেলের সদস্য মোহাম্মদ উসামা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইবকে কেন তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে কেন্দ্রীয় কমিটি বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ৩ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করেছে।
সত্য বনাম চক্রান্তের জাল?
খাবারের মূল বিল এবং সুজাউদ্দিনের আত্মপক্ষ সমর্থন করে দেওয়া এ বক্তব্য পুরো ঘটনাটিকে একটি নতুন সমীকরণের সামনে দাঁড় করিয়েছে বলে সচেতন মহল মনে করছেন। পাঁচ তারকা হোটেলের বিলিং সিস্টেমে অর্ডারের তথ্য গোপন বা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। বিলে মদের কোনো অস্তিত্ব না থাকা এবং সুজাউদ্দিনের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করার আত্মবিশ্বাসী আহ্বান- অভিযোগকারীর ‘মদ্যপানের’ দাবিটি প্রাথমিকভাবে ভিত্তিহীন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
তাছাড়া মহানগর কমিটির দাবি অনুযায়ী, যদি এটি কোনো তৃতীয় পক্ষের (যেমন হুজ্জাতুল ইসলাম সাইদ) ইন্ধনে সাজানো নাটক হয়ে থাকে, তবে এটি স্পষ্টতই একটি উদীয়মান রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার সুগভীর চক্রান্ত বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন্দ্রের কঠোর অবস্থান
একদিকে স্থানীয় নেতাদের চরিত্রহননের চেষ্টা, অন্যদিকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই স্থানীয় আহ্বায়ক কমিটির একপেশে প্রেস রিলিজ- সব মিলিয়ে কেন্দ্রের কঠোর শোকজ নোটিশ প্রমাণ করে এনসিপি নেতৃত্ব কোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা বা লবিং বরদাস্ত করছে না।
সচেতন মহল মনে করছেন, হোটেল পেনিনসুলার সিসিটিভি ফুটেজ ও এই অকাট্য বিলই প্রকৃত সত্য উদঘাটনের মূল চাবিকাঠি। এখন কেন্দ্রের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পরেই নিশ্চিত হওয়া যাবে- এটি আসলেই কোনো নেতার নৈতিক স্খলন নাকি দলের ভেতরের পদ-পদবি ও প্রভাব বিস্তারের এক নোংরা রাজনৈতিক খেলা।

