জোরপূর্বক গাড়ি পরিবর্তন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও হামলা; জিম্মি দশা থেকে মুক্তিতে চকরিয়া-মহেশখালী প্রশাসনের যৌথ হস্তক্ষেপ দাবি
হোয়ানক থেকে সংবাদদাতা◾কক্সবাজারের চকরিয়া ও মহেশখালী উপজেলার সীমান্তবর্তী যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট ‘চালিয়াতলী সিএনজি স্টেশন’ এখন সাধারণ যাত্রী ও সাধারণ চালকদের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনার জেরে চকরিয়ার বদরখালী থেকে স্টেশনটি মহেশখালীর চালিয়াতলী অংশে স্থানান্তর করার পর থেকেই মূলত এই চরম নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে।
একটি স্বার্থান্বেষী ও প্রভাবশালী পরিবহন সিন্ডিকেট এখানে রাতারাতি একটি ‘কৃত্রিম সীমানা প্রাচীর’ বা অলিখিত নিষেধাজ্ঞা তৈরি করেছে। যার ফলে প্রতিদিন চকরিয়া-মহেশখালী রুটে যাতায়াতকারী হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, দূরপাল্লার যাত্রী এবং সাধারণ চালকেরা এই সিন্ডিকেটের লাঠিয়াল বাহিনীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
পরিবহন সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা গেছে, আগে চকরিয়ার বদরখালী স্টেশন থেকে সরাসরি মহেশখালীর গোরকঘাটা বা বিভিন্ন গন্তব্যে সিএনজি ও টমটম সুশৃঙ্খলভাবে যাতায়াত করতে পারত। কিন্তু স্টেশনটি চালিয়াতলীতে নিয়ে আসার পর থেকেই শুরু হয় নিয়মনীতির প্রকাশ্য লঙ্ঘন। এখন কোনো চালক বদরখালী থেকে যাত্রী নিয়ে সরাসরি মহেশখালী আসতে চাইলে চালিয়াতলী স্টেশনে পৌঁছামাত্রই গাড়ি থামিয়ে জোরপূর্বক যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে মহেশখালী থেকে কোনো যাত্রী চকরিয়া বা বদরখালীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলে তাদেরও চালিয়াতলী স্টেশনে গাড়ি থেকে নামতে বাধ্য করা হচ্ছে।
এর ফলে যাত্রীদের মাত্র কয়েক কিলোমিটার পথের জন্য দুইবার গাড়ি পরিবর্তন করতে হচ্ছে, যা একদিকে যেমন চরম সময় অপচয় করছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।
স্থানীয় যাত্রীরা বলছেন, আগে বদরখালী বাজার থেকে গোরকঘাটা পর্যন্ত সরাসরি যাত্রায় যে ভাড়া নিত, এখন চালিয়াতলী স্টেশন থেকে গোরকঘাটা পর্যন্ত প্রায় একই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে; ফলে বাস্তবে বদরখালী–চালিয়াতলী অংশের জন্য সম্পূর্ণ বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। এছাড়াও সিন্ডিকেটটি নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত বুকিং বা চাঁদা আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই কৃত্রিম ক্রসিং পার হতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা। বিশেষ করে রাতের বেলায় স্টেশনটিতে সাধারণ যাত্রী ও নারী যাত্রীদের হেনস্তা, অশালীন আচরণ এবং জোরপূর্বক নামিয়ে দেওয়ার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সবচেয়ে অমানবিক বিষয় হলো, জরুরি রোগীবাহী গাড়িগুলোকেও এই চালিয়াতলী ক্রসিং পার হতে গিয়ে চরম হেনস্তা ও বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "নিজের দেশের ভেতরে এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় যেতে কেন আমাদের জোর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হবে? স্টেশন বদল হয়েছে আমাদের যাতায়াত সহজ করার জন্য, কিন্তু কিছু চিহ্নিত চাঁদাবাজের কারণে এটি এখন আতঙ্কের চারণভূমি।"
স্টেশনের এই ত্রাস ও সিন্ডিকেট ব্যবস্থার কারণে সাধারণ সিএনজি চালকেরাও দ্বৈত চাপে পড়েছেন। সিন্ডিকেটের কথামতো না চললে বা সরাসরি যাত্রী গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করলে চালকদের স্টেশনে ঢুকতে দেওয়া হয় না, যাত্রী তুলতে বাধা দেওয়া হয়।
কিছু চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিবাদ করলেই সিন্ডিকেটের লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে মারধর ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটানো হয়। হামলার ভয়ে অনেক চালক এখন সরাসরি রুটে গাড়ি চালাতে অনীহা প্রকাশ করছেন, যা পুরো রুটটিকে অচল করে তুলছে।
যাত্রী হয়রানি ও পরিবহন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট টিম তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে নজির সৃষ্টি করলেও, মহেশখালীর চালিয়াতলী স্টেশন ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই নৈরাজ্য যেন প্রশাসনের চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে। সময়মতো কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই সিন্ডিকেট দিন দিন আরও বেপরোয়া ও সন্ত্রাসী রূপ ধারণ করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তবে জানতে চাইলে চালিয়াতলী স্টেশন সংশ্লিষ্ট লোকজন এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন এবং এ নিয়ে কাউকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান। তাদের দাবি, স্টেশনের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং চালকদের নিয়ম মানাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয় মাত্র, কোনো যাত্রী হয়রানি বা চাঁদাবাজির ঘটনা এখানে ঘটে না।
এদিকে মহেশখালীর সর্বস্তরের ভুক্তভোগী জনগণ এই নৈরাজ্য বন্ধে অবিলম্বে এই কৃত্রিম বাধা ও সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে চকরিয়া-মহেশখালী রুটে সরাসরি নির্বিঘ্নে সিএনজি চলাচলের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে তারা বদরখালী–মহেশখালী রুটে নির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান ভাড়ার তালিকা টাঙিয়ে তা বাস্তবায়নে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা, যাত্রীকে মাঝপথে জোরপূর্বক নামিয়ে দেওয়া, হুমকি ও মারধরের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং ‘উপজেলা পরিবহন কমিটি’-র মাধ্যমে একটি জনবান্ধব পরিবহন নীতিমালা প্রণয়ন করার জোর দাবি জানান।
এদিকে সচেতন মহল মনে করেন, বদরখালী থেকে চালিয়াতলী, সেখান থেকে গোরকঘাটা- এই ছোট্ট রুটের ওপরই মহেশখালীর হাজারো মানুষের নিত্যদিনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনযাত্রা নির্ভর করে। প্রশাসন যদি দ্রুত চকরিয়া ও মহেশখালী উভয় উপজেলার যৌথ উদ্যোগে এই পরিবহন সন্ত্রাস ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য না থামায়, তবে এই আঞ্চলিক রুটটি পুরোপুরি অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মানবিক গণপরিবহন নিশ্চিতে দ্রুত প্রশাসনের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপই এখন এই অঞ্চলের একমাত্র প্রত্যাশা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়মিত তদারকি, চালক ও রুট সংশ্লিষ্টদের সাথে বৈঠক করা হয়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালিত হয়। চালিয়াতলী স্টেশনের বিষয়ে আসা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে।
