মহেশখালীতে বিশ্ব পরিবেশ দিবসেই প্যারাবন পুড়িয়ে সাবাড়, নেপথ্যে প্রভাবশালী চক্র


রকিয়ত উল্লাহ◾আজ ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। যখন দেশজুড়ে পরিবেশ রক্ষা ও বৃক্ষরোপণের ডাক দেওয়া হচ্ছে, ঠিক তখনই কক্সবাজারের মহেশখালীতে ঘটেছে উল্টো চিত্র। এক অভিনব ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ উপায়ে দিনটি ‘উদযাপন’ করেছে স্থানীয় ভূমিদস্যুরা।

দিবসের তোয়াক্কা না করে উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাঙ্গা এলাকার পশ্চিমে কয়েকশত একর সরকারি প্যারাবনে (ম্যানগ্রোভ) দিনদুপুরে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে তারা। পরিবেশ ধ্বংস করে সরকারি জমি দখল ও চিংড়ি ঘের সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই এই নিধনযজ্ঞ চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, যেখানে এই ধ্বংসলীলা চালানো হচ্ছে, তার ঢিল ছোঁড়া দূরত্বেই রয়েছে বন বিভাগের দুটি বিট কার্যালয়। অভিযোগ রয়েছে, বন কর্মকর্তাদের সাথে গভীর আঁতাত ও প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই প্রকাশ্য দিবালোকে এই লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়েছে দখলদারেরা।

আজ সকাল ১১টায় সরজমিনে ঘটিভাঙ্গা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দিগন্তজোড়া প্যারাবন থেকে এখনো পোড়া কাঠের ধোঁয়া উড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই প্যারাবনের বিস্তীর্ণ অংশে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। মূলত চিংড়ি ঘের তৈরির উদ্দেশ্যে প্রথমে এখানকার বিশাল বাইন গাছ কেটে ফেলা হয় এবং পরে প্রমাণ লোপাটের জন্য সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে আমির হোসেন নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ২০-৩০ জনের একটি সিন্ডিকেট এই নিধনযজ্ঞের মূল হোতা। এখানেই শেষ নয়, স্থানীয়রা আরও জানান, আয়াত উল্লাহ ও ফরিদসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে আরও কয়েকটি চক্র নতুন করে চিংড়ি ঘের করার জন্য প্যারাবনের অন্য অংশ কেটে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আজকের এই বিশেষ দিনে এমন ধ্বংসাত্মক কাণ্ডে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশকর্মীরা। ‘মহেশখালী পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন’-এর কর্মী আব্দুল হান্নান বলেন, "আজ আমরা পরিবেশ দিবস উপলক্ষে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভার মাধ্যমে প্যারাবন রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য লড়াই করছি। অথচ ভূমিদস্যুরা আজ প্রকাশ্য আগুনে প্যারাবন পুড়িয়ে পরিবেশ দিবসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। এটি আমাদের সমাজ ও স্থানীয় প্রশাসনের জন্য চরম লজ্জাজনক।"

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মানোয়ার হোসেন কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি কেবল বলেন, "আমরা বিষয়টির খোঁজখবর নিচ্ছি।"

তবে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়ে বলেন, "প্যারাবন নিধনকারীদের বিরুদ্ধে এর আগেও আমরা বেশ কয়েকটি উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি এবং মামলাও দায়ের করেছি। আজকের এই ঘটনাটিরও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

পরিবেশবিদদের মতে, মহেশখালীর এই প্যারাবন উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। এভাবে একের পর এক একর প্যারাবন আগুনে পুড়িয়ে ও স্কেভেটর দিয়ে মাটি খনন করে চিংড়ি ঘের তৈরি করা হলে, তা অদূর ভবিষ্যতে এই দ্বীপ অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনবে।