সবুজ স্বর্গ থেকে বিরানভূমি: দখলে বিপর্যস্ত সোনাদিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক◾কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের সোনাদিয়া দ্বীপ একসময় ছিল উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের এক নিস্তব্ধ স্বর্গ। চারপাশজুড়ে বিস্তৃত প্যারাবন, লাল কাঁকড়ার বিচরণ, কাছিমের ডিম পাড়ার নিরাপদ আশ্রয় এবং বিরল প্রজাতির পাখির কোলাহলে মুখর ছিল দ্বীপটি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই সবুজ স্বর্গে নেমে এসেছে ধ্বংসযজ্ঞ। প্রকৃতির বুক চিরে ছড়িয়ে পড়েছে চিংড়ি প্রকল্প, আগুনে পোড়া বনভূমির ক্ষতচিহ্ন আর দখলদারিত্বের রাজনীতি।

প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার সুযোগে দখল উৎসব

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, বন বিভাগ ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) জমি ব্যবস্থাপনার জটিলতা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা দ্বীপের বিস্তীর্ণ বনভূমি দখল করে চিংড়ি ঘের গড়ে তুলছে। ফলে দ্রুত বদলে যাচ্ছে সোনাদিয়ার প্রাকৃতিক মানচিত্র।

কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত প্রায় ৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সোনাদিয়া দ্বীপ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে সংরক্ষিত। আইন অনুযায়ী এখানে মাটি কাটা, বনভূমির শ্রেণি পরিবর্তন কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই চলছে বন ধ্বংসের উৎসব।

ইকোট্যুরিজমের নামে জমি হস্তান্তর, থমকে গেছে টহল

ইকোট্যুরিজম পার্ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিগত সরকার মাত্র ১ হাজার ১ টাকার বিনিময়ে সোনাদিয়ার ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর বনভূমি বেজার কাছে বরাদ্দ দেয়। ২০১৭ সালের মে মাসে বেজা উপকূলীয় বন বিভাগের কাছ থেকে জমি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। তবে এরপর সেখানে ইকোট্যুরিজম প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বরং জমি হস্তান্তরের পর বন বিভাগের টহল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং বেজার পক্ষ থেকেও কার্যকর नजरদারির অভাব দেখা দেয়। এই সুযোগে প্রভাবশালীরা বন কেটে চিংড়ি ঘের তৈরি শুরু করে। বর্ষায় চিংড়ি চাষ ও শুষ্ক মৌসুমে লবণ চাষের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকে সোনাদিয়ার প্যারাবন।

পুড়ছে বন, হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য

পরিবেশবাদীদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে হাজার হাজার একর প্যারাবন ধ্বংস হয়েছে। বাইন, কেওড়া ও অন্যান্য ম্যানগ্রোভ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, অনেক জায়গায় আগুন দিয়ে বন উজাড় করা হয়েছে। প্রকাশ্যে বন কেটে চিংড়ি ঘের নির্মাণ হলেও কার্যকর প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে না।

স্থানীয়দের দাবি, একসময় শীতকালে অসংখ্য অতিথি পাখির আগমনে মুখর থাকলেও এখন অনেক প্রজাতির পাখি আর দেখা যায় না। একইভাবে কমে গেছে লাল কাঁকড়া ও কাছিমের উপস্থিতি। ডিম পাড়তে আসা কাছিমের সংখ্যাও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে সোনাদিয়ার জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। ঘড়িভাঙ্গা থেকে সোনাদিয়া পর্যন্ত এলাকায় শতাধিক চিংড়ি ঘের গড়ে ওঠায় ভেঙে পড়ছে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য।

এদিকে, বন উজাড়ের বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর স্থানীয় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী হুমকির মুখে পড়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও আইনি জটিলতা

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সরকার দুই দফায় বন্দোবস্তি মামলার মাধ্যমে বেজাকে প্রায় ২২ হাজার একর বনভূমি দিয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার একর জমি পুনরায় বন বিভাগের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। বর্তমানে কয়েকটি মৌজায় বন সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং নতুন করে বনসৃজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আগুন দিয়ে বন পোড়ানো ও বন উজাড়ের যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার বেশিরভাগই বন বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার বাইরে সংঘটিত হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। এ ধরনের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে তারা জানান।

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোনাদিয়ায় বেজা ও বন বিভাগের উভয়ের জমি রয়েছে। বেজাকে দেওয়া কিছু জমি পুনরায় বন বিভাগের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিজ নিজ এলাকার বন সংরক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সাল থেকে সোনাদিয়ায় বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শুরু হয় এবং পরবর্তীতে কয়েক হাজার একর ম্যানগ্রোভ বন সৃজন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে উপকূল রক্ষায় এই বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

পরিবেশবিদদের মতে, প্যারাবন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি উপকূলীয় জনপদের জন্য একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়াল। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের আঘাত থেকে মানুষ ও সম্পদ রক্ষায় এর ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু বন ধ্বংসের ফলে সেই সুরক্ষা বলয় ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

সোনাদিয়ার গল্প এখন শুধু একটি দ্বীপের গল্প নয়; এটি উন্নয়ন, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রকৃতি হারানোর এক নির্মম বাস্তবতা। পুড়ে যাওয়া বনভূমি আর হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে সোনাদিয়ার নীরব আর্তনাদ।

আব্দুল করিম//