কুতুবজোমে কবির বহদ্দার ও জাহেদ সিন্ডিকেটের শক্তিশালী অপরাধচক্র

ঘটিভাঙায় সরকারি জমি দখল করে মাদকের আস্তানা

নিজস্ব প্রতিবেদক◾মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাঙা এলাকায় সরকারি জমি দখল করে গড়ে ওঠা একটি মাদকের আস্তানাকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিশাল অপরাধ নেটওয়ার্ক। এই সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করছে এলাকার কবির বহদ্দার ও সন্ত্রাসী জাহেদসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী। এলাকায় চরম অস্থিরতা সৃষ্টি, প্রতিনিয়ত সড়কে ছিনতাই, সমুদ্রে দস্যুতা, সরকারি জায়গা দখল করে অবৈধ ঘের নির্মাণ এবং প্যারাবন নিধনে ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই ভয়ংকর চক্রটি। এরই ধারাবাহিকতায় গত রাতেও এই চক্রের সদস্যরা ঘটিয়েছে এক দুর্ধর্ষ ছিনতাইয়ের ঘটনা। তবে পুলিশ ও কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, দ্রুত অনুসন্ধান করে এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা যায়, গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে বড় মহেশখালী ইউনিয়নের ফকিরাঘোনার বাসিন্দা দুবাই প্রবাসী মো. বেলাল, মো. ফয়সাল, মামুন, মানিক, আবু নাসের ও মারুফসহ বেশ কয়েকজন কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাঙা সমুদ্র সৈকতের দিকে ঘুরতে যান। সেখান থেকে ফেরার পথে ঘটিভাঙা সড়কে তারা ওত পেতে থাকা সিন্ডিকেটের কবলে পড়েন। ছিনতাইকারীরা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে নগদ ১ লাখ টাকা এবং আইফোনসহ মূল্যবান মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। ভুক্তভোগী এ প্রবাসীরা পরবর্তীতে তাদের উপর ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিবরণ দেন। 

ছিনতাইকারীরা একটি ইজিবাইকযোগে ইটের রোড ধরে ঘটিভাঙা আদর্শ গ্রাম হয়ে কালামিয়া বাজারের দিকে চলে যাওয়ার সময় ভুক্তভোগীরা সাহসিকতার সাথে ধাওয়া করে খাইরুল আমিন নামের এক ছিনতাইকারীকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হন। তবে ঘটনার পর পরই সিন্ডিকেটের মূল হোতা কবির বহদ্দার ও সন্ত্রাসী জাহেদ ঘটনাস্থলে এসে খাইরুল আমিনকে জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নিয়ে যায় এবং ছিনতাই হওয়া টাকা ও ফোন ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে চলে যায়।  

ঘটিভাঙা সড়কে এর আগের ঘটনাগুলো অনুসন্ধান করে জানা যায়, এই পয়েন্টে তাজিয়াকাটা-ঘটিভাঙা (জইব্বরগর বাপের ঘোনা সংলগ্ন) প্রধান সড়কে দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেটটি পরিকল্পিতভাবে অপরাধকাণ্ড চালিয়ে আসছে। গত প্রায় চার বছর আগে থেকেই বিভিন্ন সময় ফকিরাঘোনা, তাজিয়াকাটা, কুয়েত পাড়া, ডেম্বুনি পাড়া, আদর্শ গ্রাম ও মগকাটার একদল সশস্ত্র অপরাধী এই সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে গণ-ছিনতাই করার নজির আছে। বিশেষ করে ঈদ মৌসুমে, কিংবা কক্সবাজার থেকে ফিশিংবোটের মাছ বিক্রির টাকা নিয়ে ফেরার পথে এবং আসবাবপত্র বহনের সময় সাধারণ মানুষকে মারধর করে সর্বস্ব লুট করা এই চক্রের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত ছিল। বিগত দিনেও বহু ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারী এই সড়কে যাতায়াত করতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন। তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি ঈদের ভ্যানে করে কাপড় বিক্রি করা হকার পর্যন্ত। বিগত কিছুদিন ধরে এ প্রবণতা কিছুটা কমে আসলেও সম্প্রতি চক্রটি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বলে এলাকাবাসী জানান।

অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল কেন্দ্র হলো ঘটিভাঙা প্রবেশদ্বার ডেম্বুনি পাড়ার শুরুতে রাস্তার পাশে সরকারি জমি দখল করে গড়ে ওঠা মগকাটার কাছিম আলির পুত্র নয়নের বাড়ি। সরকারি জমি জবরদখল করে গড়ে তোলা এই বাড়িতে দিনরাত চোলাই মদ, ইয়াবা ও গাঁজার রমরমা আসর বসে, যা মহেশখালীর বিভিন্ন পলাতক ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের প্রধান নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এই চক্রের রয়েছে একটি শক্তিশালী সোর্স নেটওয়ার্ক, যার অন্যতম প্রধান সোর্স হিসেবে কাজ করে মেকানিক আনচার। থানা থেকে পুলিশ বের হলেই মিনিটেই খবর চলে যায় এই সোর্সের মাধ্যমে। ঘটিভাঙা অভিমুখী কোনো পর্যটক বা সাধারণ মানুষকে দেখলেই সংকেত দেওয়া হয় এবং নয়নের বাড়ি থেকে বের হয়ে মাত্র ১ মিনিটে প্রধান সড়কে উঠে ছিনতাই ও দস্যুতা চালায় চক্রটি।

এই ভয়ংকর সিন্ডিকেটের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে দ্বীপের আলোচিত মৌলভী জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার শীর্ষ আসামি 'বামহাতি জাহাঙ্গীর' এবং সম্প্রতি চোলাই মদসহ গ্রেপ্তার হওয়া ইয়াবা সম্রাট বার্মাইয়া মোহাম্মদ নুর। জামিনে এসে তারা নয়নের চাচাতো ভাই ছালেহ আহমদের পুত্র সন্ত্রাসী জাহেদের ১৫-২০ জনের অস্ত্রধারী বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়েছে। জাহেদের এই গ্রুপটির প্রধান কাজই হলো মোটা অংকের বিনিময়ে ভাড়াটে হিসেবে গিয়ে অন্যের চিংড়ি ঘের দখল করা, প্যারাবন কেটে ধ্বংস করা, রাস্তায় ছিনতাই, সমুদ্রে দস্যুতা এবং সাধারণ মাদক ব্যবসায়ীদের থেকে চাঁদা তোলা।

এই চক্রকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ কোন্দলও রয়েছে বলে জানা গেছে। গত রাতে ছিনতাইয়ের ঠিক এক ঘণ্টা আগে (রাত ৯ টায়) নয়নের এই মাদক আস্তানায় টাকা ভাগাভাগি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে তুমুল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এতে ৭ জন আহত হন, যাদের মধ্যে গুরুতর জখম চাঁন্দাকাটার রবি মাঝি ও নয়াপাড়ার করিম প্রকাশ হরি মাঝিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে। এই সংঘর্ষের সময়ও সেখানে কবির বহদ্দার উপস্থিত ছিলেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

চিহ্নিত মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের এই বেপারোয়া কর্মকাণ্ডে ঘটিভাঙার সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মোহাম্মদ ছিদ্দিক রিমন মেম্বার এবং ভুক্তভোগী এলাকাবাসী জানান, এই চিহ্নিত অপরাধী ও গডফাদারদের কারণে এলাকাটি অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিরাপদ করতে এবং এই জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনকে অবিলম্বে কবির বহদ্দার, সন্ত্রাসী জাহেদ ও মাদক কারবারি নয়নসহ এই চক্রের সকলকে দ্রুত গ্রেফতার করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

এ বিষয়ে মহেশখালী থানার ওসি আব্দুস সুলতান জানিয়েছেন, গতকালের ঘটনায় থানায় এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ নিয়ে আসেনি। তবে খবর পেয়ে ইতিমধ্যেই দুইজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বিষয়গুলো নিয়ে গভীর অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রকার অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না বলে তিনি সাফ জানান। পাশাপাশি, কোস্ট গার্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, উপকূলীয় এলাকায় এই মাদকের আস্তানাকেন্দ্রিক অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে শিগগিরই কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।