আমরা মহেশখালীর কথা বলি..

লাতিন আমেরিকার সাথে বাংলার বন্ধন - মহেশখালীর সব খবর

⬤ আমাদের নতুন ওয়েবসাইটে স্বাগতম। ⬤ আমাদের ওয়েবসাইট www.moheshkhalirsobkhabor.com ⬤ ফেসবুক ফেইজ www.facebook.com/m.sobkhabor ⬤ ইউটিউব চ্যানেল www.YouTube.com/Sobkhabor24x7 ⬤ ফেসবুক গ্রুপ www.facebook.com/groups/m.sobkhabor ⬤

লাতিন আমেরিকার সাথে বাংলার বন্ধন

রাজু আলাউদ্দিন আমি যেহেতু কোনো গবেষক নই, তাই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বাংলাদেশের সাথে লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কটি ঠিক কোন পর্যায়ে আছে। তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে বাঙলা সংস্কৃতির সাথে লাতিন আমেরিকার সম্পর্কের একটা দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। কম করে হলেও এই ইতিহাস একশ বছরের দীর্ঘ পরিসর অর্জন করেছে। এবং এর সূচনা ঘটেছে বাঙালি সংস্কৃতির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাধ্যমে, স্প্যানিশভাষী জগতে যিনি ‘রবীন্দ্রনাথ তাগোরে’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। দুর্ভাগ্যক্রমে স্প্যানিশ ভাষায় আমাদের অগম্যতার কারণে সম্পর্কের এই দীর্ঘ ইতিহাসটি আমাদের কাছে দীর্ঘদিন যাবত অজানা অবস্থায় ছিল। কিন্তু এখন আমরা জানি যে লাতিন আমেরিকান জনগোষ্ঠীর উদার রুচি, স্নিগ্ধ ও গ্রহিষ্ণু মন কৌতূহলের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আজ থেকে শতবর্ষ আগে। রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টিশীল ঐশ্বর্যকে তারা যে কৌতূহল থেকে গ্রহণ করেছিলেন লাতিন আমেরিকার কোনো কোনো অঞ্চলে তার সাংস্কৃতিক অভিঘাত ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ প্রবেশ করেন আর্হেন্তিনার লেখক সাংবাদিক কার্লোস মুন্সিও সায়েন্স পেনঞার অনুবাদে ১৯১৫ সালে। এই সূচনা উম্মুক্ত করে দিয়েছিল লাতিন আমেরিকার মহান ব্যক্তিত্বদের সাথে রবীন্দ্রনাথের তথা বাঙালি সংস্কৃতির এক কার্যকর সম্পর্ক। রবীন্দ্রচর্চা, রবীন্দ্র-অনুবাদ বা রবীন্দ্র-আলোচনায় একের পর এক যুক্ত হয়েছিলেন আর্হেন্তিনার ভাবুক ও মন্ত্রী হোয়াকিন ভি গনসালেস, বিক্তোরিয়া ওকাম্পো, কবি এদুয়ার্দো গনসালেস লানুসা, হোর্হে লুইস বোর্হেস, অসবালদো স্ভানাসিনি, রিকার্দো গুইরালদেস, চিত্রশিল্পী ওরাসিও আলবারেস বোয়েরো, চিলির কবি ও শিক্ষাবিদ গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, লেখক অধ্যাপক রাউল রামিরেস, কবি বিসেন্তে উইদোব্রো, কবি পাবলো দে রোকা, কবি ও রাষ্ট্রদূত পাবলো নেরুদা, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক আর্তুরো তররেস রিওসেকো। বলিবিয়ার লেখক ও কূটনীতিবিদ আবেল আলার্কন। পেরুর বামপন্থী চিন্তাবিদ হোসে কার্লোস মারিয়াতেগি ও ঔপন্যাসিক মারিও বার্গাস যোসা। দোমিনিকান রিপারলিক-এর ভাবুক ও প্রাবন্ধিক পেদ্রো এনরিকেস উরেনঞা। আর গোটা মহাদেশের একেবারে উত্তরে অবস্থিত মেহিকোতে লেখক ও দার্শনিক হোসে বাস্কনসেলোস, কবি হোসে গরোস্তিসা ও নাট্যকার সেলেস্তিনো গরোস্তিসা, অকালপ্রায়ত অনুবাদক পেদ্রো রেকেনা লেগাররেতা, এম্মা গদোই, কবি হাইমে সাবিনেস, কবি ও রাষ্ট্রদূত অক্তাবিও পাস, আন্তোনিও কাস্ত্রো লেয়াল, চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিবেরা, গাব্রিয়েল ফের্নান্দেস লেদেসমা ও রবের্তো মন্তেনেগ্রো। এরা সবাই রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির আত্মাকে কেবল স্পর্শই করেননি, সেই স্পর্শের আলো তারা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নিজ নিজ সংস্কৃতির বহুবর্ণিল পরিমন্ডলে। অন্যদিকে আমরা বাঙালিরা লাতিন আমেরিকার দিকে কৌতূহলী হতে শুরু করেছি অপেক্ষাকৃত বিলম্বে, তাদের তুলনায় প্রায় অর্ধশতাব্দির ব্যবধানে। কিন্তু দেরিতে হলেও আমরা সময়ের এই দূরত্বকে ঘুচিয়ে দিতে পেরেছি লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগ থেকে অনুবাদ, চর্চা ও গবেষণার মাধ্যমে। আপনারা হয়তো অবাক হবেন জেনে যে বাংলা ভাষায় এখন লাতিন আমেরিকার প্রায় প্রধান সব লেখকের লেখাই অনূদিত হয়েছে এবং তা ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছে। মেহিকোর মারিয়ানো আসুয়েলা থেকে শুরু করে হুয়ান রুলফো, অক্তাবিও পাস ও কার্লোস ফুয়েন্তেস, নিকারাগুয়ার কবি রুবেন দারিও, এর্নেস্তো কার্দেনাল, সের্হিও রামিরেস, চিলির গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, বিসেন্তে উইদোব্রো, পাবলো নেরুদা, নিকানোর পাররা, পেরুর ইনকা গার্সিলাসো দে লা বেগা, সেসার বাইয়্যেহো, রিকার্দো পালমা, মারিও বার্সাস যোসা, কিউবার হোসে মার্তি, আলেহো কার্পেন্তিয়ের, নিকোলাস গিয়েন, বেনেসুয়েলার রমুলো গাইয়েগোস, ব্রাজিলের জোর্জে আমাদু ও জোসে কার্লোস কাভালকান্তি বোর্জেস, আর্হেন্তিনার হোর্হে লুইস বোর্হেস, বিক্তোরিয়া ওকাম্পো ও হুলিও কর্তাসার, কলোম্বিয়ার গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। এদের প্রত্যেকের প্রধান প্রধান রচনাগুলো বাংলা ভাষায় ইতিমধ্যে অনূদিত হয়ে গেছে। স্মর্তব্য যে এরাই সব নন, আরও অনেকেই আছেন। আশা করি অপূর্ণাঙ্গ এই তালিকা থেকেই এটা স্পষ্ট হবে যে লাতিন আমেরিকার সংস্কৃতির প্রতি আমাদের সাড়া দেরিতে হলেও তা বিপুল। তাছাড়া আমাদের আগ্রহ আজ কেবল লাতিন আমেরিকান সাহিত্য ও চিত্রকলাতেই সীমাবদ্ধ নয়, গান ও ফুটবল পর্যন্ত তা বিস্তৃত হয়ে আছে। ভৌগলিক অর্থে আমরা দূরবর্তী হলেও লাতিন আমেরিকান সংস্কৃতি এখন আমাদের আত্মার ঘনিষ্ঠ সহচর। আমরা পরস্পর ভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ভূখন্ডের হলেও সংস্কৃতি আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। আমাদের পরস্পরের মনের গড়ন একই রকম বলেই হয়তো আমরা পরস্পরের এত নিকটবর্তী। আমাদেরকে আপনাদের নিকটবর্তী করেছে আরও একটি ঘটনা। সেটাও এখানে উল্লেখ করা উচিৎ বলে আমি মনে করি। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আপনাদের সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ কয়েকজন সন্তান আমাদের প্রতি যে সহানুভূতি ও সমর্থন প্রকাশ করেছেন তা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি এই সুযোগে। আর্হেন্তিনার বিখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বিক্তোরিয়া ওকাম্পো, হোর্হে লুইস বোর্হেস, এর্নেস্তো সাবাতো এবং মেহিকোর বিশ্ববিখ্যাত লেখক ও রাষ্ট্রদূত অক্তাবিও পাস আমাদের সেই দুঃসময়ে সহানুভূতি ও সমর্থন জানিয়ে যে অসামান্য বন্ধুত্বের পরিচয় দিয়েছেন তা আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাই যে সম্পর্কের মূল ভিত্তি তা আপনাদের সংস্কৃতির যেমন মূলমন্ত্র, তেমনিভাবে আমাদেরও। মনে পরছে গার্সিয়া মার্কেসের সেই উক্তি, যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা উপন্যাসে বুয়েন্দিয়া পরিবারের নিঃসঙ্গতার মূল কারণ কী। তিনি বলেছিলেন ‘ভালোবাসাহীনতা’। ঠিক একই কথা অন্যভাবে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও: ‘আমরা ভালোবাসি না বলে বুঝি না কিংবা আরও ভালোভাবে বললে দাড়ায় আমরা বুঝি না বলে ভালোবাসি না।’ আমার ধারণা পরস্পরের সাংস্কৃতির প্রতি এই অনুরাগ আমাদেরকে আরও বেশি বুঝতে ও ভালোবাসতে সহযোগিতা করবে। আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
Powered by Blogger.