৬.২.২ প্রচেষ্টার ফল: আল্লামা সুলতান যওক নদভী ও অন্যান্য আয়োজকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্ট সত্ত্বেও কিছু মানুষের হঠকারীতা ও অসহযোগীতামূলক আচরনের কারণে সকল দলের সমন্বয়ে একক ইসলামী দল গঠন সম্ভব হয়নি। তবে ২য় বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোকে পরামর্শ প্রদানের জন্য ‘সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন করা হয়। হযরতকে জোরপূর্বক এর সদস্য সচিবের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন পরিস্থিতির মুখে হযরত এ পদ থেকে ইস্তফা দেন।
৬.৩ কওমী সনদের সরকারী স্বীকৃতি: বাংলাদেশের কওমী মাদরাসার সার্টিফিকেটের সরকারী স্বীকৃতি না থাকায় কওমী পডুয়া ছাত্রদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সমাজের সর্বস্তরে তারা কাজ করার সুযোগ পায়না। লেখা-পড়া শেষ করার পর এদের কর্মক্ষেত্র সীমিত হয়ে পড়ে। এ কারণে অনেক ছাত্রকে হীনমন্যতায় ভুগতে দেখা যায়। অনেকে আবার মাঝপথে ঝরে পড়ে। শেষোক্ত শ্রেণীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। অনেকে আবার সরকারী সার্টিফিকেটের জন্য সরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এদের অনেকেই দুদিকের লেখাপড়ার চাপ সামলাতে না পেরে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারছে না। তাই কওমী সনদের সরকারী স্বীকৃতি সময়ের অনিবার্য দাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে। সময়ের এ দাবী পূরণের লক্ষ্যে আল্লামা সুলতান যওক নদভী স্বীয় অবস্থান থেকে চেষ্টা চালাতে থাকেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২০০৪ সনে সরকার কওমী মাদরাসার দাওরা হাদীসকে মাস্টার্স এর সমমান দেয়ার ঘোষনা দেয়। অবশ্য দেশের বিভিন্ন পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে বিষয়টি এখনো কার্যকর হয়নি। বিগত ২০১২ সনে সরকার এ লক্ষ্যে কওমী মাদরাসা শিক্ষা কমিশন গঠন করে। হযরতকে এ কমিশনের অন্যতম সদস্য নির্বাচিত করা হয়।
৬.৪ সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. এর বাংলাদেশ সফর: বাংলাদেশের জনগনের প্রতি আল্লামা সুলতান যওক নদভীর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ এই যে, তিনি বিশ^বরেণ্য ইসলামী চিন্তানায়ক কিংবা শতাব্দীর অন্যতম ইসলামী ব্যক্তিত্ব আল্লামা সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. এর কর্মপরিধির আওতায় এদেশকে সম্পৃক্ত করা। এ প্রসঙ্গে আল্লামা নদভী রহ. নিজেই বলেন, “এদেশে আসা এবং এখানকার মুসলমানদের অবস্থার ব্যাপারে অবগত হওয়া আমার উপর এক নৈতিক দায়িত্ব ছিল যা পালন করতে অনেক বিলম্ব হয়ে গেল।”
যাই হোক ১৯৮৪ সনের ৯মার্চ-২০মার্চ পর্যন্ত আল্লামা সুলতান যওক নদভী রহ. এর এই সফর শুধুমাত্র হযরতের প্রচেষ্টাতেই হয়েছিল। এক চিঠিতে আল্লামা নদভী রহ. হযরতকে লিখেন, “প্রকৃতপক্ষে আমার এ সফর আপনার ভালবাসা ও সম্পর্কের কারণে করা হয়েছিল। আমার কাছে প্রকৃত উদ্যোক্তা, দাওয়াতকারী ও মেজবান আপনিই ছিলেন।”
৬.৪.১ সফরের প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব: আল্লামা নদভীর এ সফর বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। এর প্রভাব ছিল অনেক গভীর ও সুদূরপ্রসারী। আল্লামা নদভীর প্রতিটি ভাষণই এদেশের ইসলামী পরিমণ্ডলে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, কিশোরগঞ্জের জামেয়া ইমদাদিয়াতে তিনি “আলেম সমাজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের লাগাম হাতে নেয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে প্রকৃত ভাষণটির কথা। ইতোপূর্বে ইসলামী পরিমন্ডলে বাংলা সাহিত্যের চর্চা ছিলনা বললেও অত্যুক্তি হবে না। অথচ এ ভাষণের তিন দশক পর আজ অপর্যাপ্ত হলেও বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার অঙ্গন বহু আলেমের পদচারণায় মুখরিত।
এ সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল এই যে, আল্লামা নদভী স্বীয় শিষ্য আল্লামা সুলতান যওক নদভীর কাজের জন্য একটি স্বতন্ত্র প্লাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন এবং সে অনুযায়ী হযরতকে দিক-নির্দেশনা দেন। আর সেই নির্দেশনা মোতাবেক প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের দারুল মা‘আরিফ। মোট কথা, আল্লামা নদভীর এ সফরের প্রভাব ও সুফল এ জাতি আজো ভোগ করে চলেছে।
৭. সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অবদান:
৭.১ বাংলাদেশের আরবী সাহিত্যের দিকপাল: আল্লামা সুলতান যওক নদভীকে বলা যায় বাংলাদেশের আরবী সাহিত্যের দিকপাল। এদেশের আরবী সাহিত্য চর্চা, লালন ও পৃষ্ঠপোষকতায় তার অবদান অনস্বীকার্য। ছাত্রজীবনে সাহিত্য প্রতিভার দ্যুতি ছড়িয়ে কর্মজীবনে এসে এ ময়দানে নিরন্তর সেবা করে যাচ্ছেন। আশির দশকের সূচনালগ্নে তার সুদক্ষ তত্ত্বাবধানে সাহিত্যচর্চায় আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া বিশ্বব্যাপি খ্যাতি অর্জনে সক্ষম হয়। ‘আস-সুবহুল জদীদ’, ‘মানারুশ শারক’ এর মত মানসম্পন্ন পত্রিকা তার তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয়। তার রচিত ও সংকলিত আরবী সাহিত্যের বেশ কিছু কিতাব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। ১৯৮২ ঈসায়ী সনে লিবিয়ায় ৩৬টি দেশের ৭৪ জন প্রতিযোগীর মধ্যে “الإسلام والمرأة” নামে আরবী প্রবন্ধ লিখে ২য় স্থান অধিকার করেন। অন্যান্য যোগ্যতার পাশাপাশি বিশেষভাবে এ যোগ্যতার কারণে নদওয়াতুল ওলামা থেকে তাকে সম্মানসূচক ‘নদভী’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। আরবী সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি আজো “রাবেতাতুল আদবিল ইসলামী” এর বাংলাদেশ ব্যুরো এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
৭.২ উর্দু ও ফারসী: আরবী সাহিত্যের পাশাপাশি আল্লামা সুলতান যওক নদভী এর উর্দু ও ফারসী সাহিত্যেও যথেষ্ট দখল রয়েছে। উর্দু ভাষায় তার গভীরতায় দিল্লী-লক্ষ্মৌ ওয়ালারাও আশ্চর্যবোধ করে। এ দুটি ভাষায় তার বেশ কয়েকটি কিতাব রয়েছে।
৭.৩ কাব্য প্রতিভা: আল্লামা সুলতান যওক নদভী স্বভাবজাত ভাবেই কাব্যপ্রতিভার অধিকারী ছিলেন। আরবী, উর্দুতে তার বেশ কিছু কবিতা সংকলন রয়েছে। তরুণ বয়সে তার একটি আরবী কবিতা বিশিষ্ট সাহিত্যিক আল্লামা কাশগরী রহ. এর হস্তগত হলে তিনি তার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
৭.৪. সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক: সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায়ও আল্লামা সুলতান যওক নদভী এর যথেষ্ট অবদান রয়েছে। পটিয়া-বাবুনগর শিক্ষকতার সময়ে তিনি ছাত্রদেরকে এ ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। আর বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠিত জামেয়া দারুল মা‘আরিফে তো ‘আন-নাদী আস-সাক্বাফী আল-ইসলামী’ নামক একটি সাংস্কৃতিক ফোরাম রয়েছে যা প্রতিষ্ঠানের প্রাণস্পন্দন হিসেবে বিবেচিত হয়। এ সংগঠন কর্তৃক পরিচালিত তৎপরতাগুলো এতই গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে যে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এর আলোকে সাংস্কৃতিক ফোরাম তৈরি করেছে।
৮. বহির্বিশ্বের সফর ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাত: আল্লামা মুহাম্মাদ সুলতান যওক নদভী তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য সেমিনার ও দাওয়াতি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে বহুদেশে সফর করেছেন। নিম্মে সফরগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পেশ করা হল।
১. ১৯৮১ সালে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সেমিনারে যোগ দিতে তিনি ভারত গমন করেন। উক্ত সেমিনারে তিনি ‘ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আরবী সাহিত্য পাঠ নির্বাচন’ বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বেশ প্রশংসিত হন। সেমিনারে অংশগ্রহষেণর সুবাদে ইসলামী জগতের খ্যাতিমান লেখক-সাহিত্যিক ও করিদের সাথে তার পরিচিতি ঘটে। এ সফরে আল্লামা সুলতান যওক নদভী রহ, নদওয়ার বিশিষ্ট উস্তাজ মাওলানা রাবে হাসানী নদভী, ড. সাঈদুর রহমান আল-আজমী, মাওলানা ড. আবদুল্লাহ আব্বাস নদভী, মাওলানা ওয়াজেহ রশিদ নদভী প্রমূখের মত আন্তর্জতিক ইসলামী ব্যক্তিত্বদের সাথে বেশ কিছু সময় কাটানোর সুযোগ লাভ করেন।
২. ১৪০৫ হিজরী নব প্রতিষ্ঠিত আদর্শবিদ্যাপীঠ দারুল মা‘আরিফের পাঠ্যক্রমের উপর মতবিনিময় ও দিকনির্দেশনার জন্য তিনি ভারত গিয়ে আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. সহ অন্যান্য নদওয়ার শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের সাথে মিলিত হন। এ সফরে তিনি আল্লামা মঞ্জুর নোমানীর সাথে সাক্ষাত করে হাদীস বর্ণনার অনুমতি লাভ করেন।
৩. ১৯৯০ সালে উপসাগরীয় সমস্যার পর্যালোচনার জন্য রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামীর আহ্বানে মক্কা মোকাররমায়া অনুষ্ঠিত এক কনফারেন্সে যোগদান করেন। এ সফরে সৌদি সরকারের ব্যবস্থাপনায় বায়তুল্লাহ শরীফের অভ্যন্তরে প্রবেশের বিরল সুযোগ লাভ করেন।
৪. ১৪০০ হিজরীতে দারুল উলুম দেওবন্দের শত বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে যোগদান করতে ভারত গমন করেন। সেখানে এক অধিবেশনে বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. এর সাথে সাক্ষাত হয়।
৫. ১৪০১ হিজরীতে নদওয়াতুল উলামার দাওয়াতে ‘শিক্ষা কারিকুলাম পর্যালোচনা’ বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে আমন্ত্রিত হয়ে ভারত সফর করেন। এ সফরে আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. তাকে বাংলাদেশে নদওয়া চিন্তাধারার প্রতিনিধি বলে সম্মানিত করেন।
৬. ১৪০২ হিজরী মোতাবেক ১৮৮২ ইংরেজীতে তিনি গবেষণামূলক এক জ্ঞান প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য লিবিয়ায় সফর করেন। বিশ্বের ৩৬ টি দেশের ৭৪ জন স্কলারের মধ্যে আল্লামা সুলতান যওক নদভী ‘ইসলাম ও নারী’ বিষয়ক প্রবন্ধের জন্য ২য় স্থান অধিকার করে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করেন।
৭. ১৪০৬ হিজরী মোতাবেক ১৯৮৬ সালে নদওয়াতুল ওলামা লক্ষ্মৌতে রাবেতা আল-আদব আল-ইসলামীর আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দিতে লক্ষ্মৌ গমন করেন। এ সেমিনারের বিষয়বস্তু ছিল ‘ইখতিয়ারুন নুসুস আল আরবিয়্যাহ মিন বিজহাতে নযরিল ইসলামিয়্যাহ’। এ প্রবন্ধটি নদওয়া থেকে প্রকাশিত ‘আল বা‘সুল ইসলামী’ ম্যাগাজিনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।
৮. ১৯৯০ সালে তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত রাবেতা আল-আদব আল-ইসলামীর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেন এবং ‘আল ইত্তেজাহাত আল আদবিয়্যা লি মুসতাওয়া আত তিফিল’ বাংলাদেশে শিশু সাহিত্য বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে প্রবন্ধটি ‘আল আদব আল ইসলামী’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়।
৯. ১৯৯২ সালে ভারতের রায়বেরেলী অঞ্চলে ‘বাংলাদেশে ইসলামী দাওয়াতের চর্চা’ শিরোনামে প্রবন্ধ নিয়ে এক সম্মেলনে যোগদান করেন।
১০. ১৯৮৪ সালে ‘জময়িয়াতুশ শাবাব,ভারত’ এর ব্যবস্থাপনায় ভারতের মাদ্রাসা সমূহে শিক্ষক্রমের উপর পর্যলোচনা শীর্ষক একটি সেমিনারে যোগ দিতে ভারত গমন করেন এবং সে সেমিনরের এক অধিবেশনে সভাপতির আসন অলংকৃত করার বিরল গৌরব অর্জন করেন।
১১. ১৯৯৯ সালে সৌদি সরকারের আমন্ত্রণে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি জাতীয় উৎসবে উপস্থিত হন। সেখানে তার উপস্থাপিত প্রবন্ধের বিষয় ছিল ‘দওরুল আরব ফি নশরিল ইসলাম ওয়াস সাকাফাতিল ইসলামিয়া ওয়াল বিলাদিল মুতাখমাহ।
১২. ২০০০ সালে বিয়াদস্থ কিং সউদ ইউনিভার্সিটির আমন্ত্রণে সৌদি আরবের বাদশা ফাহাদের শাসনব্যবস্থার বিশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সৌদি রাজধানী রেয়াদে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে গমন করেন।
১৩.২০০০ সালে রাবেতা আল আদব আল ইসলামী’র ট্রাষ্ট বোর্ডের ১৫তম বৈঠকে অংশ গ্রহণের লক্ষ্যে মিশরের রাজধানী কায়রোতে সফর করেন এবং পরবর্তীতে ২০০১ সালেও ১৬তম বৈঠকে তিনি কায়রোতে গমন করে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
১৪. ২০০১ সালে সৌদি আরবের বাদশা ফাহাদের কর্মময় জীবন উৎসবে রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে রাজধানী রিয়াদে উপস্থিত হন।
১৫. ২০০৪ সালে রাবেতা আল আলম আল ইসলামী এর ১৭ তম ট্রাষ্ট বোর্ডের মিটিংয়ে অংশগ্রহণের জন্য মরক্কোর অন্যতম শহর ফাসে গমন করেন।
১৬. ২০০৬ সালে রাবেতা আল আলম আল ইসলামীর ব্যবস্থাপনায় শ্রীলংকায় অনুষ্ঠিত ‘ইসলামে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থিত হন। সেমিনারে তার উপস্থাপিত প্রবন্ধের বিষয় ছিল ‘ইসলামে মানবাধিকার’।
১৭. ২০০৬ সালে কুয়েতস্থ আওকাফ ও ইসলামিক এফিয়ার্স মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় কয়েত গমন। সেখানে শেখ ড. ইফসুফ আল-হাজ্জী ও শেখ নাদের আন নুরী এবং বিশ্ব বরেণ্য ইসলাশী ব্যক্তিত্ব শেখ আব্দুল্লাহ আলী আল মতাওয়া এর সন্তানদের সাথে সৌজন্য সাক্ষতে মিলিত হন। এবং আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন ‘আল মুজতামায়’ তার প্রদত্ত সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়।
১৮. ২০০৭ সালে ইসলামী শিক্ষা কনফারেন্সে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে হিন্দুস্থান সফর করেন। এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সভাপতির আসন অলংকৃত করেন।
১৯. জুন ২০০৮ সনে “সকল ধর্মের শান্তিপূর্ণ অবস্থান” শীর্ষক সেমিনারে যোগদানের জন্য সৌদি আরব সফর করেন এবং সৌদি বাদশাহর সাক্ষাৎ ও উপহার গ্রহণ করেন। এ সফরের বিশেষ আকর্ষণ ছিল হযরতের পবিত্র কাবাঘরের অভ্যন্তরে প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন।
২০. ২০০৯ সনে “সকল ধর্মের শান্তিপূর্ণ অবস্থান” শীর্ষক সেমিনারে যোগদানের জন্য কাতার সফর করেন।
২১. ২০১০ সনে সৌদি বাদশাহর সৌজন্য সাক্ষাত এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য সৌদি আরব গমণ করেন।
২২. ২০১২ সনে “মা‘হাদুশ শায়খ ইলিয়াছ রহ. ঢাকা” এর উদ্যোগে আরবী ভাষা ও সাহিত্য কর্মশালা সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হন। এ কর্মশালায় ৬০০০ এর অধিক ছাত্রের সমাবেশ ঘটে।
২৩. ২০১৩ সনে “منظمة التعاون الإسلامي-الايسسكو” কর্তৃক মদীনা মুনাওয়ারাকে ইসলামী সংস্কৃতির রাজধানী করার উপলক্ষ্যে আয়োজিত কনফারেন্সে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব সফর করেন।
এছাড়াও আফগানিস্তান, শ্রীলংকা, কাতার, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সমূহে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্য সেমিনার, কনফারেন্স, সাংবাদিক সম্মেলন ইত্যাদিতে যোগদান করে দেশ ও জাতির কথা বিশ্বের গুনীজনদের সামনে তুলে ধরেছেন।
৯. রচনাবলী ও সাক্ষাৎকার: বহু ভাষাবিদ আল্লামা মুহাম্মাদ সুলতান যওক নদভী একজন সুসাহিত্যিক ও লেখক। বিভিন্ন ভাষায় তার অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ, রচনা, সাক্ষাৎকার, কবিতা ‘আল বা‘সুল ইসলামী’ ‘আল মুজতামা‘আ’ ‘আল আদাবুল ইসলামী’ ‘আল আলামুল ইসলামী’ ‘আল ওয়াউল ইসলামী’ র মত আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়। তার রচনা সম্ভার অনেক বিস্তৃত। নিম্মে তার প্রকাশিত কিতাবের উল্লেখযোগ্য কয়েকটির তালিকা দেয়া হল।
১. আত্তরীকু ইলাল ইনশা (আরবী রচনাশৈলী)- ৩খন্ড
২. কাসাসুন নাবীয়্যীন টিকা- টিপ্পনী ও অনুশীলনী সংযোজন- ৩খন্ড
৩. যাদুত ত্বলিবীনের ব্যাখ্যাগ্রন্থ (উর্দু)
৪. নুখবাতুল আহাদিস (হাদীস পুস্তিকা)
৫. শিক্ষা সংস্কারের ডাক (বাংলা ও আরবী ভাষায় প্রকাশিত)
৬. শিশুদের আরবী ভাষা শিক্ষা সিরিজ (১-৪) ক. ইশরুনা দরসান খ.আল-কিতাবুল আরবিয়্যাহ (২ খন্ড) গ. আল-কিরাতু লিররাশিদিন
৭. মুআল্লিমুল ফারসী
৮. রিহলাতী ইলা আরদিল জিহাদ ( আরবী ও বাংলাভাষায় প্রকাশিত)
৯. রাহবারে উর্দু
১০. আসান কাওয়ায়েদ (উর্দু)
১১. তাজকারয়ে আজিজ (মুফতি আজিজুল হক রহ. এর জীবনী)
১২. তাসলিয়াতুল কুলুব (হযরত মাওলানা মুহাম্মদ হারুন বাবুনগরী রহ. এর জীবনী
১৩. আল্লামা ক্বারী মুহাম্মদ তৈয়ব রহ. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (আরবী)
১৪. আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী (আরবী)
১৫. সাজারাত মিনান নুসুসিল আদাবিয়্যাহ (আরবী সাহিত্য সংকলন)- ২ খন্ড
১৬. কনদে খামাহ শরহে পন্দে নামাহ (উর্দু ভাষায় প্রকাশিত)
১৭. কুল্লিায়াতে যওক (স্বরচিত আরবী, ফারসী ও উর্দু কবিতা সংকলন)
১৮. আমার জীবনকথা
যে সমস্ত কিতাব প্রকাশের অপেক্ষায়:
১. লাহনুল ফুয়াদ (আরবী, উর্দু ও ফার্সী কবিতা সংকলন)
২. আত তালিকুজ জরুরী আলা মাকামাতে হারিরী
৩. আল জানেবুল বালাগী ফী শেরে মুতানাব্বী
৪. কালিমাতুন মুখতারাহ (স্বরচিত বিভিন্ন আরবী প্রবন্ধ সংকলন)
৫. আল খুতাবুল মিম্বারিয়্যাহ
১০ পারিবারিক জীবন:
১০.১ বিবাহ: হযরত মোট দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। ছাত্র জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে কর্ম জীবনের সূচনালগ্নেই হযরতের প্রথম দাম্পত্য জীবনের সূচনা হয়। ফারাগাতের পর হযরতের পিতা ছেলের বিবাহের জন্য পাত্রী খুঁজতে থাকেন। মুফতী আযীযুল হক রহ. এর খলিফা বোয়ালিয়া মাদরাসার মোহতামিম মাওলানা আলী আহমদ বোয়ালভী রহ. এর কন্যার ব্যাপারে তিনি খবর পান। ফলে মুফতী সাহেবের কাছে গিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এদিকে মাওলানা আলী আহমদ সাহেব ও মুফতী সাহেবের কাছে স্বীয় আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন। অতপর ১৯৫৯ সনে কোন ধরণের আনুষ্ঠানিকতা ও আড়ম্বরতা ছাড়াই সাদাসিধেভাবে বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। হযরত মুফতী সাহেব বিবাহ পড়ান এবং হযরত ইমাম সাহেব রহ. মুনাজাত করেন। হযরতের এই স্ত্রী কয়েক বছর পূর্বে ইন্তেকাল করেন। তাছাড়া হযরত ১ম স্ত্রীর শেষ সময়ে ২য় বারের মত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
১০.২ সন্তান সন্ততি: হযরত সর্বমোট ২ ছেলে ও ৫ কন্যার জনক। তন্মধ্যে ১ম স্ত্রীর পক্ষে ৪ কন্যা ও একপুত্র সন্তান জন্ম লাভ করেন। এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর পক্ষের ১ পুত্র ও এক কন্যা জন্ম লাভ করে।
১০.৩. অনাড়ম্বর জীবন যাপন: হযরত ব্যক্তিজীবনে খুবই অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেন। বিশেষভাবে কর্মজীবনের শুরু থেকে নিয়ে দীর্ঘদিন হযরত পরিবার নিয়ে টিনশেড়ের ছোট্ট একটি কুটিরে থাকতেন। সে সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেন, “…সেই ঘরের আয়তন ছিল কোন মাদরাসার ছাত্রাবাসের একটি কক্ষ পরিমাণ। … সামান্য তুফান বা ঘুর্ণিঝড়ের আশংকা হলেই আমরা বেড-বিছানা বেঁধে ছেলে-পুলা সহ মাদরাসায় চলে যেতাম। এ হালতের উপর হযরত শুকরিয়া করতেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালার শোকর যে, আম্বিয়া ও আউলিয়ার আর্থিক অনটনের কিছু নমুনা জীবনের একাংশে দেখার সুযোগ হলো।
শেষকথা: বক্ষমান প্রবন্ধে আমরা আল্লামা সুলতান যওক নদভীর বর্ণাঢ্য জীবনের উপর সামান্য আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি। কলেবরের সীমাবদ্ধতার কারণে তার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিতে হয়েছে। সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছে বিশদ আলোচনার দাবীদার বহু বিষয়কে। ফলে প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তার ব্যক্তিসত্ত্বার মূল্যায়নে ঘাটতি রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে আল্লাহর তাওফীক শামেলে হাল হলে ভবিষ্যতে প্রচেষ্টা চালানোর আশায় থাকতে হচ্ছে। পরিশেষে মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে প্রার্থনা তিনি যাতে প্রবন্ধকারসহ সবাইকে এই মহান মনীষীর জীবন থেকে কিছু আলো সংগ্রহের তাওফীক দেন। আমীন!!

অগের কিস্তি পড়ুন
গ্রন্থপঞ্জি
১. নদভী, আল্লামা সুলতান যওক, আমার জীবন কথা, আলপনা প্রকাশন- ১৪৩৫ হি
২. মাওলানা জসীম উদ্দীন নদভী ও মাওলানা আলাউদ্দীন, আল্লামা সুলতান যওক নদভী: সংক্ষিপ্ত এক বর্ণাঢ্য জীবনালেখ্য, প্রকাশকাল-২০০৬।
৩. নদভী, আল্লামা সুলতান যওক, دعوة الإصلاح والتطوير في منهاج التعليم , প্রকাশকাল: ১৯৮৫ ঈসায়ী
৪. হুদহুদ, (জামেয়া দারুল মা‘আরিফ থেকে প্রকাশিত স্মরনিকা) প্রকাশকাল: ২০০৫।
৫. দৈনিক আমারদেশ, দৈনিক ইনকিলাব, অন্যান্য জাতীয় পত্রিকাসমূহ।
শেয়ার:

মন্তব্য দিন: