মোহাম্মদ আবুল কালাম



মহেশখালীতে UNO হিসেবে যোগদানের পর থেকেই একটি সাধারণ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছিলাম প্রতিদিন ৷ তা হলো ভাগ্যোন্নয়নের জন্য অবৈধ বা সাগর পথে মালয়েশিয়ায় গিয়ে স্বপ্ন পূরণের পরিবর্তে কারাবন্দি হয়ে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য অাবেদন ৷ মাত্র UNO হিসেবে যোগদান করলাম ৷ তাছাড়া এমন সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কেও কোন ধারণা ছিল না ৷ জেলা প্রশাসক থেকে এমন কয়েকটি অাবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশনা পেয়ে থানার মাধ্যমে তা গ্রহণ করে প্রেরণ করেছি ৷ 

পরে জানলাম এমন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যগণ বন্দিকে ফেরত অানার ব্যবস্থা করার জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর অাবেদন করতেন ৷ তিনি উক্ত অাবেদনের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য UNO কে নির্দেশ দিতেন ৷ UNO অাবেদনটি OC কে প্রেরণ করতেন ৷ OC সাহেব কোন একজন দারোগাকে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে অাবেদনটি তার হাওল করতেন ৷ দারোগা সাহেব তার সময় সুযোগ মতো তদন্ত করে OC বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করতেন ৷ OC সাহেব তা UNO কে ফরোয়ার্ড করতেন ৷ UNO সাহেব তা জেলা প্রশাসককে ফরোয়ার্ড করতেন ৷ জেলা প্রশাসক তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতেন ৷ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা মালয়েশিয়ান এ্যাম্বাসিতে প্রেরণ করতেন ৷ সব মিলে একটি অাবেদন দাখিল থেকে তা মালয়েশিয়ায় পৌঁছাতে কমপক্ষে ছয় মাস লাগতো ৷ তাছাড়া বন্দীর ওয়ারিশগণ যথোপযুক্ত যোগাযোগ তদবির না করলে সে অাবেদন ও প্রতিবেদন যে কোন কর্মকর্তার ডেস্কে পড়ে থাকতো দীর্ঘ সময় ৷

একদিন ভোরবেলায় হঠাৎ শাহিদা ম্যাডাম মালয়েশিয়া থেকে ম্যাসেঞ্জারে নক করলেন ৷ তিনি এখন মালয়েশিয়ান এ্যাম্বাসির প্রথম সচিব ৷ ম্যাডামের সাথে যশোরে একসাথে কাজ করেছিলাম ৷ অসাধারণ একজন অফিসার তিনি ৷ ফেসবুকের কল্যাণে তিনি জানতেন অামি মহেশখালীতে যোগদান করেছি ৷ কুশল বিনিময়ের পর এখানকার সমস্যার কথাটি তুলে ধরলাম ৷ সাথে সাথে তিনি এ সমস্যাটির একটি বিষদ বর্ণনা দিলেন এবং মালয়েশিয়ার কারাগারে বন্দীদের মানবেতর জীবন সম্পর্কে অামাকে ধারণা দিলেন ৷ অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় গিয়ে এক হাজারের বেশি লোক সেখানকার কারাগারে বন্দী অাছেন বলে জানান তিনি, যাদের অধিকাংশই মহেশখালীর ৷ এসব বন্দীদের নিয়ে ওখানকার এদেশীয় কর্মকর্তারা বিপাকে অাছেন বলেও জানালেন তিনি ৷ অামি এ সমস্যার সমাধান বাতলে দেয়ার অনুরোধ করলাম ম্যাডামকে ৷ তিনি নির্দেশনা দিলেন এক্ষেত্রে বন্দীর ওয়ারিশগণ UNO বরাবর অাবেদন করবে ৷ UNO নির্বাচন অফিস থেকে উক্ত বন্দীর NID যাচাই করে দিবেন ৷ তার নিজের NID না থাকলে বাবা, মা , চাচা / ফুফুর NID যাচাই করে নির্বাচন অফিস প্রতিবেদন দিবেন ৷ এক্ষেত্রে অাবেদনপত্রের উপরই নির্বাচন অফিসার তার মন্তব্য লিখে দিলেই হবে ৷ তারপর তা ম্যাডামকে মেইল বা ম্যাসেঞ্জারে পাঠালেই হবে ৷ অার এটি গ্রহণের ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই মুক্তি মিলবে সে বন্দীর ৷
অত্যন্ত ফলপ্রসূ হলো ম্যাডামের নির্দেশনা ৷ UNO বরাবর অাবেদন গ্রহণ থেকে এটি মালয়েশিয়ায় পৌঁছাতে সময় লাগছে ১০ মিনিট ৷ অার মুক্তি মিলছে অসহায় বন্দীদের ৷ তারা অাবার দেশের বুকে ফিরে অাসার সুযোগ পাচ্ছে ৷ এটি সরাসরি অামার দায়িত্ব কর্তব্যের মধ্যে পড়ে কিনা জানি না ৷ তবে সে অসহায় লোকগুলো অামাকে পেয়ে বসেছিল ৷ ওদের ধারণা অামি ছাড়া কেউ তাদের উদ্ধার করতে পারবে না ৷ কত মা বাবার হৃদয়ভাঙ্গা কান্নায় অামার বুক ভারী হয়েছে ৷ তাদের পাশে দাঁড়াতে পারার অপরিসীম অানন্দে অামিও উদ্বেলিত ৷ ধন্যবাদ শাহিদা ম্যাডামকে যিনি এ অসহায় মানুষগুলোর মুক্তির দূত হিসেবে অাবির্ভূত হয়েছেন ৷

লেখক: 
মোহাম্মদ আবুল কালাম
উপজেলা নির্বাহী অফিসার
মহেশখালী
শেয়ার:

মন্তব্য দিন: