মাসুম হোছাইন চৌধুরী ।।

অজগর সাপ নাকি একবার খেলে ছয় মাস না খেয়ে থাকতে পারে, খালি ঘুমায় আর হজম করে। কৌতুক আছে গন্ডারকে চিমটি মারলে নাকি ছয় মাস পর খবর হয়। আমারো হয়েছে এই দশা। ইউরোপের কয়েকটা দেশ ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল গত বছর জুন জুলাই মাসে। ভেবেছিলাম ফিরে এসে আমার ভ্রমনের অভিজ্ঞতা লিখে রাখব। কিন্তু কেন জানি লেখা হয়ে উঠেনি। ছয় মাস পার হয়ে গেছে, এখন ওই ভ্রমনের স্মৃতির এক্সপায়ারি ডেট চলে যাচ্ছে, অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছি। ভাবলাম এখনই লিখে ফেলি। মাঝে মাঝে পড়ে জাবর কেটে দীর্ঘশ্বাস ফেলা যাবে। সবার সাথে শেয়ার করার ইচ্ছাটাও দমন করতে পারলাম না। মহেশখালীর সব খবর’র পাঠকের জন্য কিস্তি করে ভ্রমণ সমগ্রটি প্রকাশ করা হবে। 



নরওয়েতে নাটুকে মিলনপর্ব গতবছর জুনের ২৫ তারিখ আমার চার বছর বয়সী মেয়ে ইউস্রাকে নিয়ে নরওয়ে গেলাম ওর মা আমার স্ত্রী পপির কাছে, দশ মাস পর। সে এক অসাধারণ মিলনের গল্প। কিভাবে কোন পরিপ্রেক্ষিতে পপি নরওয়ে পড়তে গেল, এই দশ মাস আমরা বাবা মেয়ে কিভাবে ছিলাম এখানে সে গল্প করবো না। আরেক লেখায় সে গল্প করবো, রেখে দিলাম। অফিস থেকে ছুটি মেলেনি বেশি দিনের। মাত্র ১০ দিন। তাও রোজার ঈদের বন্ধ মিলিয়ে ছুটি। শুক্রবার শনিবারসহ সব মিলিয়ে ছুটি কাটাতে পারব মাত্র ১৩ দিন। আমার স্ত্রী নরওয়েতে পড়তে গিয়েছে। পড়া শেষ হলে চলে আসবে। আমি ব্যাংকে চাকরি করি, সব সময় ছুটি পাওয়া যাবে না, তাই যখনতখন নরওয়ে যাওয়া হয়ত আমার পক্ষে সম্ভব হবেনা। যেহেতু এবার যাচ্ছি অল্পকয়েক দিনে যতটুকু সম্ভব ইউরোপের সেনজেনভুক্ত কয়েকটা দেশ দেখার প্ল্যান করে ফেললাম আমরা। সেই মাফিক সব টিকেট করা হয়ে গেল। আমরা নরওয়ে থেকে ইতালির মিলান শহরে যাব, সেখান থেকে রোমে ট্রেনে। তারপর প্লেনে ফিনল্যান্ড হয়ে শিপে করে সুইডেন ঘুরে আবার ফিনল্যান্ড। তারপর ব্যাক করবো নরওয়ে। আমি আর ইউস্রা; বাবা মেয়ের নরওয়ে সফর শুরু হয় চট্টগ্রাম থেকে ইউএসবাংলা এয়ারওয়েজ প্লেনে, তারপর এমিরেটস প্লেনে ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে ওসলো- ট্রমসো। ওসলো থেকে ট্রমসো- দুই ঘন্টার বিমান পথ। পপি এই ট্রমসো শহরে থাকে ওর বড় ভাইয়ের সাথে যার নাম ডঃওসমান গনি যাকে আমি আর পপি বড়ভাইজান বলি। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে দুবাই এয়ারপোর্টে আমাদের প্রায় বার ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল। বাবা মেয়ের জন্য নানারকম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে নরওয়ের ওসলোতে যখন প্লেন ল্যান্ড করল; কি যে অন্যরকম ভাললাগার অনুভূতি হল বলে বুঝানো যাবেনা। ওসলোতে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় খুব টেনশন হচ্ছিল আমার, কারন যেভাবেই হোক ভিসার মেয়াদের একদিন পরে আমার রিটার্ন টিকেট কাটা; যা ঠিক করতে পারিনি। যে কারনে অনেকদিন টেনশনে কাটিয়েছি -তা এক নিমিষে কেটে গেল, কারন ইমিগ্রেশন অফিসার কিছুই বললেন না। এন্ট্রি সিল মেরে ছেড়ে দিলেন। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এরপর তাড়াতাড়ি ওয়াইফাই কানেক্ট করে ইমোতে ফোন করলাম পপিকে, আনন্দিত কন্ঠে বললাম আমরা চলে এসেছি পপি, আর মাত্র কয়েক ঘন্টা, এরপর আমাদের দীর্ঘ দশমাসের সামনাসামনি দেখার অপেক্ষা ফুরাবে। আমরা খুব এক্সাইটেড ছিলাম, আমাদের দেখা হওয়া নিয়ে। এতদিন পরে যখন দেখা হবে তখন আমরা কি করবো। যে ইউস্রা মা ছাড়া ঘুমাতে পারতোনা, ও দশমাস মাকে ছাড়া ছিল, ইউস্রা তার মাকে এতদিন পর দেখে কি করবে তা নিয়ে আমরা ইমো, ভাইবারে অনেক আলোচনা করেছি। তখন ছিল রোজার মাস। ওসলো থেকে আমরা ট্রমসো যখন পৌঁছাব তখন পপিদের ইফতারির সময়। সময় হিসেব করে দেখলাম আমরা আমাদের লাগেজ কালেক্ট করতে করতে ওরা ইফতারি করে চলে আসতে পারবে আমাদেরকে রিসিভ করতে। আমি ওদেরকে ইফতারি করে বাসা থেকে বের হতে বললাম। আমরা ট্রমসো বিমানবন্দরে ল্যান্ড করলাম। এয়ারপোর্টের ওয়াইফাই কানেকশন করতে পারছি না, তাই নেমেই কন্টাক্ট করতে পারি নাই ওদের সাথে। আমি যেহেতু ওদেরকে ইফতারি করে আসতে বলেছি দেখলাম সময় আছে, ভাবলাম আমি আর ইউস্রা একটু ভাল করে ফ্রেস হয়ে নিই, তারপর লাগেজ কালেক্ট করব। এর মধ্যে ওরা এসে যাবে। আমি আর ইউস্রা বেশ সময় নিয়ে ফ্রেশ হলাম। অন্যদিকে পপি ইফতারি করার জন্য আর অপেক্ষা করতে পারছিল না। প্যাকেটে কিছু খাবার নিয়ে ও আর বড়ভাইজান এয়ারপোর্ট রওনা হয়ে গিয়েছিল। এয়ারপোর্ট চলে এসে দেখে প্লেন ল্যান্ড করে ফেলেছে। তাড়াতাড়ি লাগেজ ডিসচার্জ প্লেসে চলে এসে আমাদের জন্য ওয়েট করতে থাকে। একে একে সব মানুষ লাগেজ নিয়ে চলে যাচ্ছে কিন্তু আমাদের দেখা নাই। এর মধ্যে ইফতারির সময় হয়। অপেক্ষা করতে করতে একসময় পপিরা ভেবেছিল আমরা মনে হয় প্লেন মিস করেছি, আমাদের সাথে যোগাযোগও করতে পারছেনা। তাই হতাশ হয়ে মন খারাপ করে ইফতারি নিয়ে বসল। যেই ইফতারি খাওয়া শুরু করল ঠিক তখনি YUSRA নামের লাগেজ ওর চোখে পড়ে যায় আর তৎক্ষনাত ওটা নিতে দৌড়ে ছুটে আসে। এদিকে আমরা ফ্রেশ হয়ে লাগেজ কালেকশন এর এরিয়াতে আসলাম। লাগেজের সারি বেল্টে ঘুরছে তো ঘুরছে। 

 
ইউরোপের একটি লোকেশনে লেখক

আমাদের তিন লাগেজের কোন হদিশ নাই। হঠাৎ দেখতে পেলাম লাল রঙ এর আমাদের একটা লাগেজ যেটাতে ইউস্রা নিজ হাতে YUSRA লিখেছিল, যা আমি ভালভাবে টেপ দিয়ে আঁটকে দিয়েছিলাম। ওটা দেখতে পেয়েই তৎক্ষনাত আমি দৌঁড়ে হাত বাড়ালাম, যেন হাতছাড়া না হয়, কিন্তু একি একটা মেয়ে এসে লাগেজে হাত দেয়। তাকিয়ে দেখি এক জ্যাকেট পড়া, বেশ স্মার্ট, চশমা পরা সুন্দরি একটা মেয়ে। অবাক বিস্ময়ে বিমোহিত আমি দেখি এ যে আমার বউ পপি! পপিও অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে একবার আমার দিকে একবার ইউস্রার দিকে। আনন্দে আমরা সবাই চিৎকার দিয়ে উঠি, একে অপরকে আলিঙ্গন করি। অনেকক্ষণ আমরা তিনজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিলাম।ইউস্রা ওর মাকে দীর্ঘ দশমাস পর দেখল। অনেক অভিমানে অথবা লজ্জায় প্রথম প্রথম মাথা নিচু করে ছিল। মনে হয় ওর কান্না আটকাচ্ছে। আমরা আমাদের নরওয়ের মাটিতে প্রথম দেখা হওয়া নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি কিন্তু এরকম নাটকীয় ভাবে হবে তা ভাবিনি। অদূরে সহাস্যমুখে বড়ভাইজান আমাদের মিলন পর্বের ছবি তুলতে থাকেন। 

 (চলবে)
শেয়ার:

মন্তব্য দিন: