কিছু কথা শুরু করার জো থাকে না। এটিও তেমন একটি কথা। "কাহার দোষ দিইবো, সকলইতো আমার অদৃষ্টের দোষ! নতুবা রাজার রাণী, রাজার বধূ, রাজার মহীয়সী হইয়া; কে আমার মতো চির দুঃখিনী হইয়াছে বলো? একথা সম্রাট নাসির উদ্দীনের স্ত্রীর হলেও মহেশখালীর বেলায়ও পুরোপুরি মিলে যায়। কেননা মহেশখালীতেই বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রকল্প, সে হিসেবে জমিও মহেশখালীর। ফারাক শুধু এখানেই; আমাদের কর্মসংস্থান, বাসস্থান সবই রূপান্তরিত হবে উদ্বাস্তুকরণে। যেটির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ কল্পনা করাটাও হতাশাজাগানিয়া। মহেশখালীতে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর সুনির্দিষ্ট ম্যাপ মহেশখালীবাসী জানেন না। শুধু জানেন ভূমি অধিগ্রহণের কথা। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, মহেশখালীকে সিঙ্গাপুরের আদলে উন্নত শহরে পরিণত করা হবে। সেই থেকে আমরা আনন্দ আত্মহারা, প্রকৃতপক্ষে দিশেহারা। দিশেহারাতো হওয়ারই কথা, আমাদের কর্মস্থল থাকবে না, ভিটে-বাড়ি থাকবে না, এমনকি অস্তিত্বও থাকবে না। তাহলে মহেশখালীর থাকলোটা কী? দিনশেষে মহেশখালী পরিণত হল এক খণ্ড সিঙ্গাপুরে। চারিদিকে উন্নয়নে দ্বীপটি এভাবেই ভরে যাবে, তা অতুলনীয়। লাভ? এটা কেমন হবে, একবার অনুমান করা যাক। প্রাথমিক অবস্থায় কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কথা বাদই দিলাম। শুধু ভূমি অধিগ্রহণের কথায় আসা যাক। ইতঃপূর্বে বহুবার বলা হয়েছে, "মহেশখালীতে যদি পানের চাষ না হয়, লবণের চাষ না হয়, মৎস্য চাষ না হয়; তাহলে ওই কথিত সিঙ্গাপুর লই আমরা করবোটা কী? আমরা জানি, স্বর্ণ, হিরা, মণিমুক্তা এসব খুবই দামি পদার্থ। এসব শরীরে কিছুটা থাকলেও সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। যদি এমন হয়, হাতে-পায়ে, নাকে-গলায়, কোমরে-পিঠে মণিমুক্তার ঝনঝনানিতে আমাদের শরীর নুয়ে পড়ে একেবারে মাটিতে মিশে যায়, সেটি কি আর অলঙ্কার থাকে -নাকি বোঝায় রূপ নেয়? নিঃসন্দেহে বোঝা। আমাদের বেলায়ও ঠিক তেমনই, উন্নয়নের বোঝা।

৩৬৮ বর্গ কিলোমিটারের পাহাড় সমৃদ্ধ সাগর বেষ্টিত প্রকৃতির অপরূপ ছোট্ট একটি দ্বীপ মহেশখালী। এখানকার মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচার মিশে একাকার যেমনটি মিশে একাকার হয়েছে মহেশখালী চ্যানেলটি বঙ্গোপসাগরে। ভাগ্য কি দুর্ভাগ্য জানি না, হয় তো বা ভৌগোলিক কারণে নতুবা আমাদের নির্বুদ্ধিতার কারণে এখানে হতে যাচ্ছে কয়লা বিদ্যুৎ-খ্যাত জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড। তারপরও জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে মহেশখালীর মানুষ জাতির জনকের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে নিজেদের বসত-ভিটেও সরকারকে উদার মানসিকতায় ছেড়ে দিচ্ছে। তাহলে উদারতার প্রতিদানও উদারতা নতুবা মহানুভবতা দিয়ে হতে পারতো কিন্তু তা হয়নি। হচ্ছে গৃহহীন, উদ্বাস্তু এবং দিশেহারাকরণে।

মাতারবাড়ি, ধলঘাটা, কালারমার ছড়া, কালীগঞ্জ, হেতালিয়া ঘোনা, উত্তর নলবিলাসহ আর বেশ কিছু জায়গা সরকার উন্নয়নের স্বার্থে অধিগ্রহণ করেছে। এ কথা অতীত এবং পুরানো। তাহলে নতুনত্ব কী? এখানেও একটা বিরাট প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রথমত পুনর্বাসন, দ্বিতীয়ত জমির দাবীকৃত মূল্য, তৃতীয়ত কর্মসংস্থান, চতুর্থত পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, পঞ্চমত মাতৃভূমির অস্তিত্ব! কথাগুলো অতি সংক্ষেপিত হলেও একেকটি সূত্র বিরাট প্রশ্নের জন্ম দেয়। আমরা সেসবের কোনোটার যথাযথ উত্তর পাইনি। তাহলে এটি আগ্রাসন না হয়ে উন্নয়ন হবে কেন? মহেশখালীবাসী প্রত্যাশা করে, উন্নয়ন যেন আগ্রাসনে রূপ না নেয়।

শুধু এটুকুতেই শেষ নয়। শিক্ষাদীক্ষায় পিছিয়ে পড়া একটা জাতি বুঝলেও কী বুঝবে; সেদিকে না হয় গেলাম না। ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে ৩০%-এরও বেশি কর্তন যাবে কেন? এখানে দালাল একটা মাধ্যম মাত্র। আমলারাই এ কর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার পায়তারা করছে। এই-সেই বলতে বলতে করতে করতে ৩০-৩৫% শেষ। বাকি ৭০% টাকা পেল, একই সাথে নিঃস্ব হয়ে পথেও বসলো। তাহলে এটি কীভাবে উন্নয়ন হয়, আগ্রাসনই তো যথাযথ। নদীতীরবর্তী জমি অধিগ্রহণের পর এবার নজর পাহাড়ের দিকে। পরিবেশের ভারসাম্যের দিকে তোয়াক্কা না করে গাছগাছালি, বনজঙ্গল উজাড় এবং পাহাড়কে মরুভূমিতে রূপান্তরিত করে উন্নয়নের নামে সাবাড়ে দাঁড় করিয়েছে। ফলে পরিবেশ তো বড়ই হুমকির সম্মুখীন, একইসাথে জনবসতিও অস্তিত্ব সঙ্কটে। কেননা অধিকাংশ জনসমষ্টি পাহাড়ি অঞ্চল তথা ১২ নং মৌজায়। এখানে যেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠছে, "মানুষের চেয়ে উন্নয়নের গুরুত্ব বেড়ে অনেক"। যে কারণে মহেশখালীবাসীর জন্য এটি আর উন্নয়ন থাকলো না, পরিণত হয়েছে আগ্রাসনে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বনজঙ্গল, পাহাড় এবং পাহাড়ি অঞ্চল যদি অধিগ্রহণের নামে আগ্রাসনে চলে যায়, তাহলে মহেশখালীর নামটা ছাড়া অবশিষ্টই থাকলোটাই কী? মহেশখালীতে জনবসতির অস্তিত্ব যদি না থাকে তাহলে জাতীয় সংসদের ২৯৫ নং আসন (কক্সবাজার-২)-এর অস্তিত্ব থাকবে? যেখানে সংসদীয় আসন থাকবে কি না সেটি নিয়েই সন্দেহ, সেখানে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বারের অস্তিত্বের কল্পনা করাটাও তো বোকামি। তাহলে চাপিয়ে দেওয়া উন্নয়ন আগ্রাসনে পরিপূর্ণতা পেতে আর কতক্ষণ? মহেশখালীবাসী উন্নয়নের স্বার্থে সরকারের সাথে একমত এবং এবং একান্ত সহযোগী। তবে তা যেনো পরিবেশের ভারসাম্য মেনেই হয়, একইসাথে উন্নয়ন যেন আগ্রাসনে রূপ না নেয়, সেটিই সবার প্রত্যাশা।

মুহম্মদ রুহুল আমিন
মহেশখালীর সন্তান, শিক্ষক ও লেখক

Share To:

Sobkhabor24x7

Post A Comment:

0 comments so far,add yours