Advertisement


১ লাখ টন লবণ আমদানির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মহেশখালীতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ


জয়নাল আবেদীন।। দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন ও মাঠে বিপুল পরিমাণ লবণ মজুত থাকা সত্ত্বেও সরকার নতুন করে এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়ায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রবিবার (১১ জানুয়ারি) সকাল থেকে মহেশখালী উপজেলা চত্বরে শত শত লবণচাষি, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নেন।

লবণচাষি, শ্রমিক ও ছাত্রসমাজের ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচিতে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী বিভিন্ন প্রার্থী এবং একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতারাও সংহতি প্রকাশ করেন। বক্তারা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে উপকূলীয় লবণ শিল্পের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে আমদানির অনুমতি প্রত্যাহারের দাবি জানান।

মহেশখালীর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল শুক্কুর সিআইপি, কক্সবাজার–২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আলহাজ্ব আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা জিয়াউল হক, বিএনপি নেতা আতাউল্লাহ বোখারী, জামায়াত নেতা জাকের হোসেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও ছাত্রনেতারা।

হাফেজ আবদু রহিমের কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশের সূচনা হয়। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক এস এম রুবেল। উপস্থাপনায় ছিলেন নোমান ইলাহি ও সালমান কায়ছার। ছাত্রদের পক্ষে বক্তব্য দেন ওসমান সরওয়ার মানিক।

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী সকাল থেকেই মহেশখালী ও আশপাশের লবণ উৎপাদন এলাকা থেকে চাষি ও ব্যবসায়ীরা উপজেলা চত্বরে জড়ো হন। ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে তারা লবণ আমদানির সিদ্ধান্ত বাতিল, দেশীয় লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং চাষিদের জন্য বাজার সুরক্ষা ব্যবস্থা চালুর দাবি তোলেন।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রে মহেশখালীর পাঁচটি এবং কক্সবাজার জেলার ৭৮টি মিলসহ মোট ২৩১টি প্রতিষ্ঠানকে অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৪২৯ দশমিক ১৮ মেট্রিক টন পর্যন্ত লবণ আমদানি করতে পারবে। শর্ত অনুযায়ী ঋণপত্র খোলার দুই মাসের মধ্যে এই আমদানি সম্পন্ন করতে হবে এবং আমদানিকৃত লবণ অবশ্যই পরিশোধন করে ভোজ্য লবণ হিসেবে বাজারজাত করতে হবে। বিসিককে সে বিষয়ে প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের আগের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে বিসিকের তালিকাভুক্ত ২৪৭টি লবণ মিলকে সমহারে এক লাখ মেট্রিক টন লবণ আমদানির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরে আবেদন ও কাগজপত্র যাচাই শেষে গত ৩০ ডিসেম্বর ২৩১টি মিলকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

বক্তারা অভিযোগ করেন, বিসিকের ভুল তথ্য এবং মন্ত্রণালয়ের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ভূমিকার কারণেই এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

তবে স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীরা এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁদের ভাষ্য, নতুন মৌসুমে ইতোমধ্যেই উৎপাদন শুরু হয়েছে এবং মাঠে গত বছরের বিপুল পরিমাণ লবণ এখনও মজুত রয়েছে। এই অবস্থায় আমদানি হলে দেশীয় লবণের দাম আরও কমে যাবে এবং চাষিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন।

সমাবেশ শেষে বিক্ষোভকারীরা লবণ আমদানি স্থগিত, দেশীয় উৎপাদকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, সহজ শর্তে ঋণ ও সঞ্চয় সুবিধা চালু এবং সরকারি পর্যায়ে কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।

চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকা এবং কিছু এলাকায় উৎপাদন কম হওয়ায় চাষিরা এমনিতেই উদ্বিগ্ন। তার ওপর আমদানির ঘোষণায় সেই শঙ্কা আরও গভীর হয়েছে। স্থানীয় নেতারা সতর্ক করে বলেন, নীতিগত সমাধান ও বাজার সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া দেশীয় লবণ শিল্প অচিরেই বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।