পরিদর্শনকালে গতকাল সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় করছে। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জ্বালানি নিরাপত্তার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি। মাতারবাড়ি ও মহেশখালীর অনেক প্রকল্প দেশের বিপুল সম্পদ ব্যয় করে করা হলেও কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতায় সেগুলো এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) প্রকল্পটি কমিশনিং হওয়ার পরও শুধু ঠিকাদার নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতায় ঝুলে ছিল। আমরা এখন সেই পরিস্থিতির সমাধান করে এই মেগা প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ সুফল দেশবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি।
জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমরা ন্যূনতম ৯০ দিনের জ্বালানি সংরক্ষণ বা মজুদ করতে পারি। অতীতে এই সক্ষমতা ছিল না। এখন আমাদের ‘রেডি স্টোরেজ’ কোথায় আছে এবং তা দ্রুততম সময়ে কীভাবে বাড়ানো যায়, তা আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।”
সফরের প্রথম দিনে প্রতিমন্ত্রী আকাশপথে চট্টগ্রাম পৌঁছে দ্রুতগামী বিশেষ নৌযানে করে গভীর সমুদ্রে স্থাপিত ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল (এফএসআরইউ) পরিদর্শনে যান। বর্তমানে দুটি এফএসআরইউ-এর মাধ্যমে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সমুদ্রপথের এই জটিল ও স্পর্শকাতর কারিগরি ব্যবস্থা তদারকি শেষে তিনি মহেশখালীর মাতারবাড়িতে পৌঁছান। সেখানে প্রকল্পের প্রকৌশলীরা ম্যাপ ও চার্ট ব্যবহার করে প্রতিমন্ত্রীকে প্রকল্পের অগ্রগতির বিস্তারিত ব্রিফিং প্রদান করেন।
এ সময় কারিগরি আলোচনায় মাতারবাড়িকে একটি ‘ডাবল স্টেজ আইল্যান্ড’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, যা কোহলিয়া নদীর মাধ্যমে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। কর্মকর্তারা প্রতিমন্ত্রীকে জানান, মাতারবাড়িতে কন্টেইনার টার্মিনালের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হয়েছে এবং পাশাপাশি একটি বাণিজ্যিক জেটি নির্মাণের জন্য খনন কাজ চলছে। এছাড়া প্রস্তাবিত ল্যান্ড বেজড এলএনজি ও এলপিজি টার্মিনালের এলাকাটিও তিনি সরজমিনে পরিদর্শন করেন।
বৈশ্বিক সংকট ও দেশের অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব নিয়ে প্রতিমন্ত্রী একটি গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বা করোনা মহামারীর চেয়েও বর্তমানের মধ্যপ্রাচ্য সংকট বিশ্ব অর্থনীতিকে অনেক বেশি প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তবে এই সংকট নিরসন রাতারাতি সম্ভব নয় জেনে আমরা বিকল্প উৎস নিয়ে কাজ করছি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে কয়লা আমদানির প্রতিটি ধাপ মন্ত্রণালয়, বাপেক্স এবং পেট্রোবাংলা সরাসরি তদারকি করছে। আগে প্রকল্পের তথ্য পেতে আমরা ঠিকাদারদের ওপর নির্ভর করতাম, কিন্তু এখন প্রতিটি মুহূর্ত আমরা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছি।
সফরকালে প্রকল্প এলাকার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, “এই মেগা প্রকল্পগুলো পুরো বাংলাদেশের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। এখানে যে পরিমাণ উন্নয়ন হচ্ছে, তা শুধু এই অঞ্চল নয়, বরং পুরো দেশের অর্থনীতির ভাগ্য বদলে দেবে।”
এই উচ্চপর্যায়ের সফরে প্রতিমন্ত্রীর সাথে সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ ছাড়াও কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এবং মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সফরের দ্বিতীয় দিনে আজ শনিবার প্রতিমন্ত্রী মহেশখালীর এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) প্রকল্পের বিশাল ট্যাংক ফার্ম এবং গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। সবশেষে মহেশখালীর ঐতিহাসিক আদিনাথ ঘাট হয়ে স্পিডবোট যোগে তিনি কক্সবাজার ত্যাগ করবেন এবং আকাশপথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন। প্রতিমন্ত্রীর এই সফর মহেশখালী-মাতারবাড়ি অঞ্চলের প্রকল্পগুলোতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বলে আশা করছেন বলে অভিজ্ঞরা মনে করছেন।
প্রসঙ্গত: সরকারি সফরসুচিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ একই সফরে মহেশখালী আসার কথা উল্লেখ থাকলেও রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি এবার আসতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
