মহেশখালীতে স্কুল ভবন নির্মাণে ব্যাপক লুটপাট: ‘ছাত্রলীগ কোটায়’ বিএনপি নেতাদের ভাটোয়ারা!


ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, অতিথি প্রতিবেদক ।। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় ২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণে ব্যাপক লুটপাট ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হালিমুর রশিদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘প্যাভিলিয়ন বিল্ডার্স’ চরম নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ আমলে প্রভাব খাটিয়ে কাজটি বাগিয়ে নিলেও সরকার পরিবর্তনের পর এখন স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে ‘ভাটোয়ারা’ এবং এলজিইডি কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই এই অনিয়ম চালাচ্ছেন তিনি। স্থানীয়রা একে ‘ছাত্রলীগ কোটায় ভাটোয়ারা’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

জানা গেছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ২ কোটি ১২ লাখ ৬৮ হাজার ২৪৭ টাকা ব্যয়ে উপজেলার কালারমারছড়া চিকনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ পায় প্যাভিলিয়ন বিল্ডার্স। অভিযোগ রয়েছে, এই ভবনের বেজ (ভিত্তি) ভরাট করা হয়েছে পার্শ্ববর্তী মসজিদের জানাজার মাঠ কেটে। এতে জানাজার মাঠটি সংকুচিত হয়ে পড়ায় স্থানীয়দের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

হাতের চাপে খসে পড়ছে ঢালাই, ব্যবহার হচ্ছে জংধরা লোহা:

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ভবন নির্মাণে ‘সিলেট স্যান্ড’ বা উন্নতমানের বালুর বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে স্থানীয় চিকনিপাড়া ছড়া থেকে তোলা কাদামিশ্রিত ও লবণাক্ত বালু। শিডিউলে ১ নম্বর ইট ব্যবহারের কথা থাকলেও ব্যবহার করা হচ্ছে দেড় ও দুই নম্বর ইটের খোয়া। ভবনের সিঁড়ির রেলিং ও জানালায় নতুন লোহার বদলে জংধরা পুরোনো স্ক্র্যাপ লোহা ব্যবহার করা হয়েছে। দরজায় উন্নতমানের সারকাঠের বদলে দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত কাঁচা (সাফউড) কাঠ, যাতে এরই মধ্যে ফাটল ও কালচে দাগ দেখা দিয়েছে। সিমেন্টের পরিমাণ কমিয়ে কাদামিশ্রিত খোয়া দেওয়ায় ঢালাইয়ের কংক্রিট হাতের চাপেই গুঁড়ো হয়ে ঝরে পড়ছে।

গত মঙ্গলবার (১২ মে) দ্বিতীয় দফায় পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী আল-আমিনের উপস্থিতিতেই ছড়া থেকে কাদামিশ্রিত বালু উত্তোলন করে ব্যবহার করা হচ্ছে।

খোদ প্রকৌশলীরাই দিচ্ছেন হুমকি:

স্থানীয় যুবক সোহেলসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, কাজের অনিয়ম নিয়ে ইউএনও এবং উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিনকে জানালে তারা উল্টো অভিযোগকারীদের নাম ঠিকাদার হালিমের কাছে ফাঁস করে দেন। এরপর ছাত্রলীগ নেতা হালিম অভিযোগকারীদের নানাভাবে মামলা-হামলার হুমকি দেন। হালিমের শ্বশুর স্থানীয় এক বিএনপি নেতা হওয়ায় কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না।

বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য মনিরুল আলম জানান, অনিয়মের প্রতিবাদ করায় বিগত সরকারের আমলে ঠিকাদারের রোষানলে পড়ে স্থানীয় অনেককে মিথ্যা মামলার শিকার হতে হয়েছিল। তিনি বলেন, “জানাজার মাঠ কেটে মাটি নেওয়ার বিষয়ে প্রকৌশলী রাহাতসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার জানালেও কোনো প্রতিকার মেলেনি।”

শিক্ষকদের অসহায়ত্ব:

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল আউয়াল কাদামিশ্রিত বালু ব্যবহারের কথা স্বীকার করে বলেন, "নির্মাণ শ্রমিকেরা ঢালাইয়ে ঠিকমতো পানি (কিউরিং) দেয় না বলে শুনেছি। মাঝে শ্রমিক সংকটে কাজ বন্ধ ছিল। পরে উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী রাহাদুল ইসলাম শ্রমিক নিয়োগের দায়িত্ব নেন, এখন তার মাধ্যমেই কাজ চলছে।"

    "লবণাক্ত বা কাদামিশ্রিত বালু ব্যবহার করলে কংক্রিটের ‘বন্ডিং স্ট্রেন্থ’ মারাত্মকভাবে কমে যায়। একইসঙ্গে জংধরা লোহা ব্যবহার করলে ভবনের রড দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, যা কয়েক বছরের মধ্যেই ফাটল সৃষ্টি করে এবং ভবন ধসের মতো বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে।"

    -আফতাবুর রহমান, অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

কী বলছেন বিএনপি নেতারা?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা বলেন, "কেউ ছাত্রলীগ করেছে বা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছে বলেই সে বৈধ ব্যবসা করতে পারবে না, এমন নয়। কিন্তু একজন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে যখন বারবার সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ ওঠে, তখন তাকে কেন রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া দেওয়া হবে? রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি কিছু বিএনপি নেতার সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে এই অনিয়ম চালাচ্ছেন। এর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।"

অভিযুক্ত ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:

সব অভিযোগ অস্বীকার করে প্যাভিলিয়ন বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হালিমুর রশিদ বলেন, "রাজনৈতিক কারণে প্রতিপক্ষ আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা অভিযোগ তুলছে। সরকার পরিবর্তনের পর আমাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে। আমি লোকসান দিয়েই কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছি।"

এ বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী বনি আমিন জনি বলেন, "আমরা এখনো ভবনের পুরো কাজ বুঝে নিইনি। নির্মাণকাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। আগে অনিয়মের তথ্য পেয়ে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছিলাম।" তবে এলজিইডি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কাদামিশ্রিত বালু ও জংধরা লোহা ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।