মাহবুব রোকন◾কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত সামিট গ্রুপের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ কাজ শুরুর পর সারা দেশে গ্যাস সরবরাহে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গতকাল সকাল ৮টা থেকে সামিটের রিগ্যাসিফিকেশন (পুনঃগ্যাসে রূপান্তর) কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে, যা আগামী ৭ নভেম্বর শনিবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা ৮০ ঘণ্টা কার্যকর থাকবে। এর ফলে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক ৪৬১ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ কমে গিয়ে চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ সারা দেশের আবাসিক, শিল্প, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে তীব্র সংকট ও স্বল্পচাপ সৃষ্টি হয়েছে।
মহেশখালী টার্মিনাল বন্ধে গ্রিডে ধস: বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র ও আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে গড়ে ২ হাজার ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হতো। দেশের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রধান মাধ্যম কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান টার্মিনাল- যার একটি পরিচালনা করে সামিট গ্রুপ (দৈনিক সক্ষমতা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট) এবং অপরটি আমেরিকার এক্সিলারেট এনার্জি (দৈনিক সক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট)।
পেট্রোবাংলা পূর্বানুমান করেছিল, সামিটের টার্মিনালটি বন্ধ থাকলে আমদানি করা ৯২০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ কমে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামবে এবং জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সরবরাহ ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বুধবার সকালে কাজ শুরুর পর চিত্র আরও নাজুক হয়ে পড়ে। সকাল ৮টায় যেখানে জাতীয় গ্রিডে ২৫৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ছিল, সকাল ১০টার হালনাগাদ তথ্যে তা একলাফে কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৯ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ পেট্রোবাংলার ধারণার চেয়েও ১৭১ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি গ্যাস সরবরাহ কমেছে। এলএনজি থেকে রূপান্তর কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫১৪ মিলিয়ন ঘনফুটে।
আবাসিক, শিল্প ও সিএনজি স্টেশনে স্থবিরতা: মহেশখালীর টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম ও ঢাকার জনজীবনে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে থাকা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আগেই জানিয়েছে, টার্মিনাল বন্ধ থাকা অবস্থায় তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের গ্যাসে তীব্র স্বল্পচাপ বজায় থাকবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায়,
রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আজিমপুর, ধানমন্ডি, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, কালুরঘাট ও নাসিরাবাদসহ বিভিন্ন শিল্প ও আবাসিক এলাকায় বুধবারে রান্নাবান্নার চুলা প্রায় বন্ধ ছিল। অনেক বাসাবাড়িতে মাটির চুলা কিংবা ইলেকট্রিক ওভেন ব্যবহার করতে হচ্ছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমে উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা তৈরি পোশাকসহ প্রধান রফতানিমুখী খাতগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পেট্রোবাংলার বক্তব্য ও গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান: এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে "চার দিন সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে" মর্মে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও পুরোনো ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। এই বিষয়টিকে উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত ও গুজব আখ্যা দিয়ে পেট্রোবাংলা স্পষ্ট করেছে যে, গ্যাস সরবরাহ কোনোভাবেই পুরোপুরি বন্ধ থাকবে না, তবে সরবরাহ কমে যাওয়ায় কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে স্বল্পচাপ সৃষ্টি হতে পারে। অনিচ্ছাকৃত এই সাময়িক ভোগান্তির জন্য পেট্রোবাংলা ও কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে।
আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মত: উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও মহেশখালীর এই টার্মিনালে একই ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন, একটি মাত্র টার্মিনাল বন্ধ হলেই পুরো দেশের জ্বালানি ও উৎপাদন খাত অবশ হয়ে পড়ার এ ঘটনা প্রকাশ করে দেয় আমদানিনির্ভর গ্যাসের বড় ধরনের ঝুঁকি। জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির গতি বজায় রাখতে মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালগুলোর সুরক্ষার পাশাপাশি দেশীয় বঙ্গোপসাগর ও স্থলভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আগামী ৭ নভেম্বর বিকেল ৪টার মধ্যে সামিট এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ সফলভাবে শেষ হবে এবং দ্রুত জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।
