বার্তা পরিবেশক◾কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে সুবিধা নেওয়া ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেষ্টা নিয়ে নতুন করে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ আমলে প্রভাবশালী অবস্থানে থেকে সুবিধা নেওয়া আপন চৌধুরী এখন পারিবারিক রাজনৈতিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ ও নানা আলোচনা-সমালোচনা।
স্থানীয় সূত্র ও বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর ভাষ্য, মাতারবাড়ির সিকদার পাড়ার বাসিন্দা আপন চৌধুরী দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনামলে তিনি রাজনৈতিক প্রভাবের সুবিধা পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আপন চৌধুরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় রাজনীতিতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আপন চৌধুরীর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এখন বিএনপির রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগের অন্যতম বিষয় হচ্ছে আপন চৌধুরীর পারিবারিক রাজনৈতিক সম্পর্ক। তিনি মাতারবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আরিফুল কাদের চৌধুরীর ভাতিজা। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দাবি, এই আত্মীয়তার সম্পর্ককে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে তিনি দলের সাংগঠনিক পরিসরে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের কঠিন সময়ে যারা মাঠে ছিলেন, মামলা, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাদের পাশ কাটিয়ে কেবল পারিবারিক পরিচয় কিংবা আর্থিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে নতুনদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হলে তা তৃণমূলে বড় ধরনের অসন্তোষ তৈরি করবে।
একাধিক নেতাকর্মী অভিযোগ করেন, আপন চৌধুরী আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে মাতারবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পদেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কিংবা সরকারের সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিরা যদি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর হঠাৎ বিএনপির পরিচয়ে সামনে চলে আসেন, তাহলে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা নেতাকর্মীদের অবস্থান কোথায় থাকবে?
মাতারবাড়ির কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মী বলেন, দলের দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন না করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের সামনে আনা হলে তৃণমূলে বিভাজন তৈরি হতে পারে। তাদের দাবি, কারও পারিবারিক পরিচয়, অর্থনৈতিক সামর্থ্য কিংবা স্থানীয় প্রভাব নয়, বরং অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা যাচাই করেই দলের সাংগঠনিক পরিসরে অবস্থান নির্ধারণ করা উচিত।
এদিকে আপন চৌধুরীকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা মন্তব্য ও সমালোচনা দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ তাকে ‘নব্য বিএনপি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলছেন। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে তৃণমূলের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আপন চৌধুরীর বক্তব্য জানা গেলে প্রতিবেদনে তা সংযোজন করা হবে। একইভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার কথিত সুবিধা গ্রহণ, সম্পদ অর্জন কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নথি ও তথ্য যাচাই করাও জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এ অবস্থায় মাতারবাড়ীর তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশ কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের সাংগঠনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, দলীয় পরিচয় ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং তৎকালীন সময়ে তার ভূমিকা যাচাই করা হোক।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে সুবিধাবাদী রাজনীতির সুযোগ তৈরি হলে বিএনপির দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের অর্জন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তাই ব্যক্তির প্রভাব বা পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তে রাজনৈতিক ত্যাগ, সাংগঠনিক ভূমিকা ও অতীত কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি তাদের।
মাতারবাড়ির এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



