সুহৃদ রহমান

অমর একুশে বইমেলাকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘তৃতীয় চোখ’ থেকে এবারও বেশ কিছু নতুন বই বের হয়েছে। ভাল মানের বই করার জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক বছর ধরে বেশ পরিচিত হয়ে ওঠেছে।  মেলা উপলক্ষে যথারীতি চেষ্টা করেছেন পাঠকের হাতে সুন্দর ও নান্দনিক বইটি উপহার দেয়ার জন্য। তপ্রকাশক আলী প্রয়াসের কঠোর পরিশ্রমের ফসল প্রতিটি বই। ঢাকার একুশে বই মেলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্তরে তৃতীয় চোখের স্টল থাকেই প্রতিবছর। তৃতীয় চোখ থেকে প্রকাশিত বইয়ের খোঁজ খবর ও বই সর্ম্পকে কিছু তথ্য দিতেই এ লেখার আয়োজন।

তরুণ কবি রুবেল সরকারের প্রথম বই ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশ পেয়েছে। রুবেল সরকার গত ১৫ বছর ধরে কবিতচর্চা করে আসছেন, তার মধ্যে বাছাইকৃত কবিতা নিয়ে এবারের বের করল প্রথম কাব্যগ্রন্থ। বইটির সর্ম্পকে মূল্যায়ন লিখেছেন বাংলাদেশের অন্যতম কবি এবারের বাংলা একাডেমী পুরষ্কার প্রাপ্ত কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। তিনি বলেন―‘কবিতার এইসব চিরকালীন কথা রুবেল সরকার জানেন। আবেগকেও পরাতে জানেন প্রজ্ঞার লাগাম। শব্দই কবির ব্রহ্মাস্ত্র। তার কাছে ঋণী হতে হয় কবিকে। রুবেল সরকারের ভাষায়―‘শব্দের মায়াস্ত্রে কবি নিজেই পরাভূত চিরকাল’। এপরাভব কবির আমৃত্যু অতৃপ্তি। শব্দের জলতরঙ্গে কবি এক নিরন্তর ডুবুরি। এ আড়াল-আখ্যানও রুবেলের অজানা নয়―‘শব্দের এ পারাবতী পুকুর, আমায় শেখালো আড়িডুব’।

স্মৃতির সঞ্চয় নিয়ে দূরের স্বপ্নযাত্রা―রুবেল সরকারের কবিতা। স্বপ্নের  দুয়ারে-দুয়ারে তার অনর্গল কড়ানাড়া। রুবেলের ভাষায়―‘তালার গল্পগুলো ঘুরে যাবে চাবির মোচরে―/রুপোর খিড়কি ভেঙে লুট হবে অজস্র দুয়ার’। অর্থাৎ, পাঠকের দুয়ারে পরাবাস্তব কড়া নাড়তে এসেছে রুবেল সরকারের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’।’ সুখপাঠ বইটি সংগ্রহে রাখার মতো।

শিউলি সিরাজের বই―‘বুনোহাঁস ও বিয়োগ অপেরা’ বেরিয়েছে তৃতীয় চোখ থেকে। শিউলি উত্তর-শূন্য দশকের বিরল গোত্রের সেই কবি যাঁর কবিতা একই সাথে ব্যক্তিচেতনা ও সমাজচেতনার দ্বান্দ্বিক রূপভাষ্য। ৪ফর্মার বইটিতে কবিতার বিষয় আর মেজাজ বিবেচনায় লেখাগুলো তিন পর্বে ভাগ করা হয়েছে : বুনোহাঁস ও বিয়োগ অপেরা, কোথাও বালিকা রোদ ও তবু ঘোর তবু ভোর। মোট ৭১টি নির্বাচিত কবিতার এই সংগ্রহের তৃপ্ত অবগাহনে, পাঠক খুঁজে পাবেন কবির হিরণ¥য় নিরালোক, নির্জন হৃদয়―শিশিরে ধুয়ে যা ‘শিউলি’ হয়েই ফুটে আছে। ‘জীবন মানে স্নানের মতো বিরহ বারবার...’ ―এই অনন্ত বিরহস্নানের সাথে অনতিক্রম্য ঋণের মতো যে প্রেম, তারই সংরক্ত লিপিকার কবি শিউলি সিরাজ; বইটির মূল্যায়ন লিখেছেন দেশ বরেণ্য কবি আসাদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “শিউলি সিরাজের সমকালীন কবিদের কবিতা পাঠের আনন্দ-অভিজ্ঞতা তার কাব্য ভাষায় ফুটে উঠেছে। বাক-প্রতিমা বা চিত্রকলা নির্মাণ সাম্প্রতিক কবিদের কাব্যিক পরিচয় বহন করে,একসময় উপমা-উৎপ্রেক্ষার ভূমিকাও ছিল একইরকম।”

জয়ন্ত জিল্লু সমকালীন তরুণ কবিদের সবচেয়ে প্রোজ্বল কবি। সরল ভাষা বিন্যাসের অনন্য মুন্সিয়ানায় তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে সুখপাঠ্য―যা কবিতা পাঠকদের নিয়ে যায় ভিন্নমাত্রিক বোধের কাছাকাছি। এবারে তার দুটো কবিতাগ্রন্থ বেরিয়েছে প্রথমটি ‘ক্যালেন্ডার সিরিজ’ দ্বিতীয়টি ‘পৃথিরবীর কোথাও রাস্তা দেখি না (দ্বিতীয় মুদ্রণ)। প্রসঙ্গত বলতে হয়, ২০১৪ সালে প্রথম বইয়েই জিল্লু কবি হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পান। ফলে এবছর তাঁর প্রথম বইয়ের দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছে। অপরদিকে এবারে তাঁর নতুন বই ‘ক্যালেন্ডার সিরিজ’ অন্যরকম ভালোলাগার একটি বই। কবি তাঁর কবিতায় একটি ক্যালেন্ডার উপমার ভেতর দিয়ে ব্যক্তি জীবনের নিঃসঙ্গতা, সময়ের বাস্তবতা, সমাজের বিচ্যুতি ও রাষ্ট্রের দৈন্যতাগুলো অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ক্যালেন্ডার সিরিজ নিঃসন্দেহে এবারের বইমেলায় পাঠকমহলে সাড়া ফেলবে। কেননা কবি জয়ন্ত জিল্লু কমিটমেন্ট নিয়ে কবি লিখেন। এই সুখপাঠ্য গ্রন্থটি পড়ার আহ্বান জানাই পাঠকসমাজকে।

নাসের ভুট্টো নব্বই দশকের কবি। সমাজ ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে তার আজন্ম সেøাগান। প্রয়োজনে ফুল ছুঁেড় ভেঙেছে বৈষম্য, প্রথা আর প্রত্যাখান। প্রতিদিন বর্ণচাষ করেন, মননের ভাঁজে। বাস্তবতার ঘোর ঠেলে খোঁজে ফেরেন বৃক্ষের নিবিড় পাঠ, দিগন্তের আভা আর সুন্দরের অনন্ত বৈভব। তার ভাষা ভিন্ন, গভীর অনুভূতির ছোঁয়ায় যা পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে আলোড়িত। নস্টালজিক, কু-সংস্কার, গণমানুষের মুক্তি ছড়িয়ে আছে কবিতার পর কবিতায়। এমনই কথাভাষ্য নিয়ে নাসের ভূট্টো এবারের বই মেলায় এসেছে - ‘অনিবার্য ধুলো রোজই ওড়ে’  এবং ‘দীঘিভরা প্রাচীন মেঘ’ নামের দুটো কবিতার বই। 

কবিতার চৌকাঠে সদ্য পা দেয়া মেধাবী তরুণ কবি ফারুক আজিজ, ‘শব্দগোলাব’ নামে কবিতার প্রথম বই এসেছে এবারের মেলায়। শৈশব-কৈশোর ও প্রাক্-যৌবনের হাজারও স্মৃতি-কোমলতায় বলতে চেয়েছেন তার ব্যক্তিগত সুখ, দুঃখ, কল্পনা, ভয়, ক্ষোভ, আশা-নিরাশা ও সম্ভাবনার স্বপ্নকথা। হৃদয়ের চাপা কান্না কিংবা দীর্ঘশ্বাস তার ভাষিক অনুভূতির আবেগী সঞ্চারে সিক্ত হয়েছে প্রতিটি কবিতা।
রনি চক্রবর্তী এ শহরের একবারে নবীন লিখিয়ে একজন কবিতা কর্মী। তৃতীয় চোখ থেকে সাহস করে বের করেছেন কবিতার বই ‘বিষণœতার গ্রাফ’। তার কবিতার ফ্ল্যাপে কবি পিয়াস মজি বলেছেন- ‘রনি চক্রবর্তী তার কবিতার বইয়ের নাম দিয়েছেন বিষণœতার গ্রাফ। অবশ্য জীবনের বিষণœতা ও আনন্দ-অভিজ্ঞান, দুইয়েরই আস্বাদ পাওয়া যাবে এই বইয়ে। পাশাপাশি সমাজ রাষ্ট্র-রাজনীতিক চিন্তায়ও জাগর তার কবিসত্তা। এই তরুণ কবি যেমন প্রেমের সর্বব্যাপ্ত জলে নিজের স্নান সারেন তেমনি স্মৃতির পাহাড়েও হাতড়ে ফেরেন পলাতক প্রেমকে।’

কক্সবাজার সমুদ্র সন্নিধির নস্টালজিয়ায় জায়মান কবি মনজুরুল ইসলাম। নিরন্তর শব্দসা¤্রাজ্যে ডুবে থাকা এ কবি কয়েক দশক ধরে সমুদ্র জনজীবনের নান্দনিক অনুভব ঐন্দ্রজালিক রূপময়তা ও প্রতœ-চেতনায় সার্থক রূপায়ণ করে চলছেন অপরূপ সৃষ্টি বিভায়। তাঁর কবিতায় শব্দপ্রবাহ সমুদ্রের মতো মুখর ও বহুমাত্রিক ভাবে-চিত্রে পরিপূর্ণ। তৃতীয় চোখ থেকে বের হয়েছে তাঁর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘ফলকহীন বধ্যভূমি’। তাঁর কবিতা প্রসঙ্গে কবি আলী প্রয়াস লিখেছেন-‘ছন্দ-অন্তঃপ্রাণ কবি মনজুুরুল ইসলাম একই সাথে কবিতার প্রকরণ ও আঙ্গিকে বিচিত্রানুগামী—শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের বহুল ব্যবহার কবিতাকে দিয়েছে প্রগাঢ় শিল্পরূপ। প্রকৃতি প্রেমের পাশাপাশি ব্যক্তি ও দেশপ্রীতির অনিবার্য উপস্থিতি তাঁর কবিতাকে দিয়েছে অনন্য দ্যোতনা। বৈশ্বিক ও দেশীয় সামাজিক-মানবিকতার অপরিহার্য বাস্তবতা মূর্ত হয়ে ওঠেছে এ-কাব্যের সমূহ চরণগুচ্ছে। উপলব্ধির আশ্চর্য গভীরতায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্বপ্ন ও স্বদেশ অনুরাগের অনবদ্য প্রকাশ তাঁর ‘ফলকহীন বধ্যভূমি’।

প্রচার বিমুখ, নির্ভীক ও নিভৃতচারী কবি আহমেদ তৌহির কবিতায় কৌমার্য সমর্পণ করেছেন অনেক আগেই। কিন্তু পাঠক জেনেছে পরে। কাব্যপ্রেমে মগ্ন তিনি গোপনে গোপনে সন্তান-সন্ততির জন্ম দিয়েছেন অনেক। আবার এদেরকে বাড়িয়ে তুলেছেন মাতৃস্নেহে-পরম লালিত্যে। এ ক্ষেত্রে কবিতার শৈল্য চিকিৎসক কবি নিজেই। কাব্য প্রতিভায় অনন্য ও চিন্তায় শক্তিমান এ কবি নিয়ত লিখে চলেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের বইমেলায় বের হয়েছে কবিতার বই ‘ঈশ্বরের কালোহাত’ এর দ্বিতীয় সংস্করণ। তাঁর কবিতায় শিল্পের চেয়ে উপলব্ধির গভীরতাই বেশি প্রকাশ পেয়েছে। সমাজ বাস্তবতার জটিল অভিজ্ঞতা ও তিক্ততার বয়ান অত্যন্ত নির্মম ভাবে কবির কলমে ধরা দিয়েছে। বৈচিত্র্যময় জীবনের অধিকারী, শেকড় সন্ধানী,  প্রগতিশীল কবি আহমেদ তৌহির যতটা না শিক্ষিত পুরুষ তার চেয়ে বেশি অর্জিত মানুষ। 

গাজী সাইফুল একজন ছাত্র। কলেজে পড়–য়া অবস্থাতেই সৃজনশীলতা পরিচয় পায় তার প্রথম উপন্যাস ‘শেষ বিকেলে প্রণয়’র মাধ্যমে। তৃতীয় চোখ থেকে এবারের মেলায় বের হয়েছে উপন্যাসটি। বের হওয়ার সাথে সাথে ব্যাপক সাড়াও ফেলেছে।‘শেষ বিকেলের প্রণয়’ প্রেম, অপ্রেম, প্রণয় কিংবা স্বপ্ন-বিরহের মনোদৈহিক কল্প-যাতনার শিল্পিত কাহিনী। লেখকের অপূর্ব অনুরাগ মাখা স্বপ্নময় স্মৃতি চারণা, অতৃপ্ত আত্মা-দেহের কথকতা―যাতে মুদ্রিত আছে আবেগ, বিশ্বাস, ভালোবাসায় মোড়া হারানো, বিজিত আর সাহসী মানুষের চিত্র; যা পাঠক পাবে খ- খ- গল্পের ভেতরে অখ- আখ্যানের চমকপ্রদ স্বাদ।
 
কবি বিপ্রতীপ অপু বেশ পরিচিত পাঠক মহলে। তার বিশাল ভক্ত পাঠক আছে। সহজ অথচ হৃদয়গ্রাহী ভাষায় কবিতা লিখেন বিপ্রতীপ অপু। অবচেতনার আলো আঁধারি নয়, বরং স্পষ্টতার দিকেই তাঁর ঝোঁক যেন বেশি। সমীকালীন প্রসঙ্গে তিনি মাঝে মধ্যে নিয়ে আসেন পুরনো শব্দের আমেজ, তবে ঝন্দসর্তকতা ও বাকসংযমের গুণে তাঁর কবিতা পেয়ে যায় নিটোল এক অবয়ব। এমন নিটোল ভাষার কবিতার বইটি করেছে প্রকাশনা সংস্থা ‘তৃতীয় চোখ’।
 
‘তৃতীয় চোখ’ থেকে প্রকাশিত সব বই ঢাকার বই মেলায় লিটল ম্যাাগাজিনের ৮৫ নং স্টলে পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া তৃতীয় চোখের পরিবেশক বেহুলা বাংলা, পড়–য়া ও চট্টগ্রামের বাতিঘরে পাওয়া যাবে।
শেয়ার:

মন্তব্য দিন: