বিশেষ প্রতিনিধি 
এক সময় পুলিশ বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনীতে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি ছিলো অকল্পনীয়। এখন প্রতিযোগিতার দুনিয়ায় পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন নারীরা। দুনিয়ায় বাংলাদেশের গৌরব উজ্জ্বল করতে বরাবরই অহঙ্কারজনক ভূমিকা রাখতে শুরু করেছেন বাংলাদেশের নারীরা। আর সেই গৌরবোজ্জ্বল আলোকযাত্রায় কক্সবাজারের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মহেশখালীও পিছিয়ে নেই। প্রান্তের এই দ্বীপবাসীকে সেই গৌরবের খাতায় নাম লিখিয়ে দেওয়া একটি মেয়ের নাম নাছিমা আকতার। শাপলাপুরের এক নিবৃত পল্লীতেই যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বর্তমানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। 

নাছিমা আকতার। মহেশখালীর এই মেয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে সহকারি উপ-পরিদর্শক (এএসআই) পদমর্যাদায় একজন তরুণ নারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বপালন করে চলেছেন। মূলত বাংলাদেশ পুলিশের স্পোর্টস কোরের একজন দক্ষ কর্মী হিসেবে নাছিমা নিজ বাহিনীতে বেশ সমাদৃত। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর মুখ উজ্জ্বল করতে তার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। বাহিনী আগামীতে তার কাছ থেকে আরও বড়ো ধরণের সাফল্য আশা করেন বলে পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্রে প্রকাশ। 

সার্বিক ভাবে সুন্দরী, দীর্ঘদেহী ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই তরুণী দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও নিজের উজ্জ্বলতম ভূমিকা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। পশ্চিম গোলার্ধের সবচেয়ে দরিদ্র যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ হাইতিতে জাতিসঙ্ঘ বাহিনীর হয়ে একটি ইউনিটের টিম লিডারের দায়িত্ব পালন করেন। ক্যারিবীয় সাগরের হিস্পানিওলা দ্বীপের পশ্চিম এক-তৃতীয়াংশ এলাকা নিয়ে গঠিত এই দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে আন্তর্জাতিক বাহিনীর হয়ে দায়িত্ব পালনের সুযোগ বিষয়টিও বেশ ভাগ্যের ব্যাপার বলে মনে করা হয় । বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীতে খুব কম বয়সেই একজন সৌকস কর্মকর্তা বা সদস্য হিসেবে নিজকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হওয়ায় নাছিমা আকতার জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে দায়িত্বপালনের সুযোগ পান বলে বাহিনী সূত্রে প্রকাশ। মিশনের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৬ সালের ১ জুলাই তিনি মিশনের সাথে যুক্ত হন। সম্প্রতি জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশন শেষে দেশে ফিরেছেন তিনি। গতকাল রাতে তার ক্যারিয়ারের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে কথা বলেন আমাদের সাথে। মহেশখালীর সব খবর’ র সাথে আলাপকালে তিনি তার স্বল্পতর জীবনের নানা বিষয় তুলে ধরেন। 

এখনও অবিবাহিত মি.নাছিমার জন্ম মহেশখালীর শাপলাপুরে। বাবার নাম মরহুম নুরুল ইসলাম। মা রহিমা খাতুন। ইউনিয়নটির মুখবেকি গ্রামেই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এই গ্রামেই। শিশুবেলা থেকেই তার ভেতরে দুরন্তপনা কাজ করতো। খেলাধুলা ও দেশের পুলিশ বাহিনীর প্রতি ছিলো তার গভীর মুগ্ধতা। পড়ালেখায় বরাবরই একজন ভালো ছাত্রী হিসেবে নিজকে উপস্থাপন করতে সক্ষম ছিলো নাছিমা। নারী হয়েও তার ভেতরে স্বপ্ন ছিলো পড়ালেখা করে হয়ত একজন দক্ষ পুলিশ হবে, নতুবা বড়ো মাপের এক খেলোয়াড় হবেন তিনি। সেই যে -শৈশব ও কৈশোরে তার মানস গঠন হয়েছিল, -তার পরিণতিও হয় স্বপ্নের বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। আজ তিনি একাধারে দক্ষ পুলিশ ও চৌকস খেলোয়াড় দুটিই।   

নাছিমা ভারতের শিলং এ অনুষ্ঠিত ২০১৬ সালের সাউথ এশিয়ান গেমস এ অংশগ্রহণ করেন। সেবার রেসলিঙে ৫৩ কেজি ক্যাটাগরিতে ব্রোঞ্জের পদক লাভ করে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেন মহেশখালীর এই জিনিয়াস। জাতীয় পর্যায়ে ২০১৫ সালে রেসলিঙে ৫৩ কেজি ক্যাটাগরিতে স্বর্ণ পদক জেতেন। ২০১৬ সালে শ্রেষ্ঠ নারী পুলিশ খেলোয়াড় গৌরব অর্জন করেন এবং বাংলাদেশের পুলিশ প্রদানের হাত থেকে পদক গ্রহণ করেন। একই ভাবে খেলাধুলায় তার ক্যারিয়ার জীবনে বহু পুরস্কার লাভ করেন বলেও সূত্রে প্রকাশ। 

মুলতঃ ২০১১ সালের ইন্দো-বাংলা গেমসের মাধ্যমেই দেশ ও দেশের বাইরে প্রতিনিধিত্ব করা শুরু তাঁর। তাছাড়া শান্তি রক্ষা মিশনে থাকাবস্থায় পুলিশকে নিয়ে করা জাতিসংঘের একটি ভিডিও ডকুমেন্টারিতে মূল চরিত্রে অংশগ্রহণ করেন মহেশখালীর সাহসী এই নারী। মিশনে দায়িত্বকালীন তার রয়েছে পেশাদারিত্ব সুলভ বড়ো সাফল্য।

যুদ্ধপীড়িত হাইতিতে জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করার ব্যাপারে তিনি বলেন- মূলত: ২০-২২ জনের একটি দলের টিম লিডারের দায়িত্ব পালন করতে হতো তাকে। খোদার রহমতে কোনো প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হলেও সব সময় সময় সার্বক্ষণিক এলার্ট থেকেই এই সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে এই দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।

আলাপকালে একদম ব্যক্তিগত প্রশ্নেরও তিনি সাবলীল জবাব দেন হাসোজ্জ্বল ভাবেই। ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত সুন্দরী এই নারী বিয়ে বা যুগল জীবন সম্পর্কে কি ভাবছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন -এতোদিন ক্যারিয়ার গঠন ও মানুষ হিসেবে নিজকে প্রস্তুত করার কাজে নিবেদিত ছিলাম। এখন হয়তো বিয়ের ব্যাপারে চিন্তা করার সুযোগ এসেছে। খোদার রহমতে সব ঠিকঠাক থাকলে বিয়ের বিষয়টি দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করারও আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। তবে এখনো এনিয়ে কোনো পক্ষের সাথে পারিবারিক ভাবে কথা চালাচালি শুরু হয়নি বলেও তথ্য দেন মহেশখালীর এই জিনিয়াস। 

মূলত: চাকরি জীবনের গত ১০ বছর ধরেই একাধারে ডিএমপিতে কর্মরত আছেন তিনি। এখানে থেকেই সক্রিয় ভাবে বিভিন্ন ইভেন্টে ক্রীড়া চার্চ করে চলেছেন তিনি। যখন কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, বার্ষিক আয়োজন বা জাতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন উঠে, -ঠিক তখনই প্রথম দিকেই ডাক পড়ে নাছিমার। বাংলাদেশ পুলিশের প্রিয় অঙ্গনকে মুগ্ধতায় মাথিয়ে রাখতে নাছিমা আকতারের প্রশংসনীয় ভূমিকার কথা বেশ স্বীকার্য।  

পুলিশ বাহিনীতে চাকরি নেওয়ার পটভূমি সম্পর্কে মি. নাছিমা আকতার বলেন- ছোটো বেলা থেকেই পুলিশের ব্যাপারটি ভালো লাগত। মূলতঃ বিভিন্ন মুভি দেখেই তিনি পুলিশের চাকরির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন বলে জানান। চলচ্চিত্রে বিভিন্ন পর্যায়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও তার মূল উদঘাটনের পুলিশের কর্মপদ্ধতির প্রেমে জড়িয়ে পড়ার ভেতরেই কখন যেনো তিনি নিজেও পুলিশ হয়ে গেলেন। রাষ্ট্র ও তার দেয়া চাকরির প্রতি তার সর্বোচ্চ সম্মানের জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করে করে চলেছেন বলে জানান তিনি।  

আলাপকালে তিনি তার জন্মমাটি মহেশখালীবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সাথে তিনি সকলের দোয়া কামনা করেন। তিনি জানান চাকরি জীবনের ব্যস্ততার ভেতরে যখনই একটু সুযোগ জুটে -তখনই নীরবে মহেশখালী এসে ঘুরে যান। পৃথিবীতে মহেশখালী একটি অন্যতম সৌন্দয্যমণ্ডিত নৈসর্গিক স্থান বলে মনে করেন তিনি। দূর মফস্বলের একদম তৃণমূলের একটি গ্রাম থেকে ওঠে আসা একজন নারী যে সময় ও জীবনের সাথে যুদ্ধ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে তার একটি ক্ষুদ্রতম নমুনা শাপলাপুরের মেয়ে নাছিমা আকতার। আমরা মহেশখালীর সব খবর  টিম-তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। মহেশখালীবাসীর পক্ষ থেকে জানাই অশেষ শুভেচ্ছা।  





শেয়ার:

মন্তব্য দিন: