Advertisement


মহেশখালী ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, কথিত অফিসের লোক ও দালালের পোয়াবারো


সংবাদদাতা।। সরকারি অফিস সমূহের সেবা সাধারণের কাছে সহজলভ্য করে তুলতে সরকার যেখানে নানান উদ্যোগ গ্রহণ করছে, সেখানে কিছু কিছু অফিসের কতিপয় ব্যাক্তির কারণে সেবাপ্রার্থীদের কাছে তা প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। এতে করে দুর্নাম ছড়িয়ে পড়ছে সর্বক্ষেত্রে।

জানা গেছে- মহেশখালী উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ১টি পৌরসভায় ৬টি ভূমি অফিস রয়েছে। মাতারবাড়ি কালারমার ছড়া, হোয়ানক, শাপলাপুর ইউনিয়নে রয়েছে এ সব ভূমি অফিস। প্রত্যেক অফিসগুলোই পরিনত হয়েছে দুনীর্তির আখড়ায়। অফিসগুলোর কিছু লালিত দালালচক্রের মাধ্যমে রীতিমতো দর কষাকষির মাধ্যমে চলে ঘুষ বাণিজ্য। এদের মধ্যে দালালেরা সেবা গ্রহণকারীদেরকে বিভিন্ন রকম সমস্যা দেখিয়ে ও অফিস খরচের নামে প্রকৃত ভূমিকরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা আদায় করে থাকে।

খবর নিয়ে জানা গেছে- নামজারী খতিয়ানের রিপোর্ট দিতে গড়িমসি করতে করতে পার করেন মাসের পর মাস। অনেক সময় উৎকোচের বিনিময়ে উল্টো রিপোর্ট দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। দূরদুরান্ত হতে আসা সেবা গ্রহীতাগণ ভূমি অফিসের নানা গাফিলতির কারণে দালালের মাধ্যমে আসতে বাধ্য হন বলে জানিয়েছে অনেক ভুক্তভোক্তি।

অভিযোগ রয়েছে- খতিয়ানের কাজ চলমান অবস্থায় দিতে হয় কর্মরত প্রত্যেক টেবিলে হিসেবে নানা অংকের উৎকোচ। কুতুবজোম, ছোট মহেশখালী, বড় মহেশখালী ও গোরকঘাটাসহ সর্বমোট ৪টি ইউনিয়নের লোকজন গোরকঘাটা অফিসে ভূমি কর পরিশোধ করা ও নামজারি সংক্রান্ত সেবা গ্রহণ করতে আসে। এতে করে উক্ত ভূমি অফিসের অস্থায়ী স্টাফ (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) মোহাম্মদ জসিমের চাহিদা মতো টাকা দিতে রাজি না হলে সেবা গ্রহণকারীদের বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করা হয়। ফলে সেবাগ্রহীতাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। খসড়া খতিয়ান নিতেও দীর্ঘ ভোগান্তি পেতে হয়, খতিয়ানের ভলিয়ম দেখতেও লাগে চা খরচের নামে ১০০—২০০ টাকা। অফিসে এসেই সেবা প্রার্থীরা পড়েন মোহাম্মদ জসিমের খপ্পরে। এই পরিচ্ছন্নতাকর্মী জসিম নিজের পরিচয় লুকিয়ে এসিল্যান্ড এর এক নম্বর লোক হিসেবে নতুন পরিচয় সৃষ্টি করে পুরু অফিসকেই নিজের কব্জায় রেখেছে বলে বহু ভুক্তভোগীর অভিযোগ।

সম্প্রতি সরেজমিনে অনুসন্ধানে গেলে দেখা যায়- ভূমি অফিস এলাকায় অন্তত: ১০/১২ জন পরিচিত দালাল ঘোরাঘুরি করছে। মুলত: তাদের নেপথ্য কারিগর পরিচ্ছনতাকর্মী জসিম। এই জসিমের যোগসাজসে দর কষাকষি করে খতিয়ান সৃজনের কাজ করে থাকে।

ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা অনেক ভুক্তভোগি জানান- মূলত: এ অফিসের স্টাফ ও তহশীলদারের আশ্রয়ে পালিত হয় এসব দালাল চক্র। ডিসি অফিসের নির্ধারণী তালিকায় যে ভূমিকর নিধার্রণ করা হয়েছে, সে অংকমতো ভূমি কর নেওয়ার নজির নেই গোরকঘাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি অফিসসহ উপজেলার অন্যান্য ভূমি অফিসগুলোতে।

ভূমি অফিসগুলো ভূমি কর আদায় করা ছাড়াও নামজারির আবেদন তদন্তের দায়িত্ব পালন করে থাকে তহশীলদার। নামজারির আবেদনকারী অনেকে জানান- আবেদন ভূমি অফিসে তদন্তের জন্য আসলে অফিসের পরিচ্ছন্নতাকমী জসিম অফিস থেকে কল দিয়ে অফিসে ডেকে এনে বিভিন্ন মিথ্যা সমস্যা আছে বলে মোটা অংকের টাকা আদায় করে। সরকারিভাবে নামজারির জন্য ২০ টাকার কোর্ট ফি, ৫০ টাকা নোটিস জারি ফি, খতিয়ান ফি ১০০ টাকা ও রেকর্ড সংশোধন ফি ১০০০ টাকাসহ সর্বমোট ১,১৭০ টাকা হলেও এখানে প্রতিটি খতিয়ান ফি ১৫-২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অনায়াসে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে অধিগ্রহণের জমির খতিয়ান হলেতো আর কথাই নেই।

এদিকে ঘুষ ছাড়া জমির নামজারি হয় না গোরকঘাটা উপজেলা ভূমি অফিসে এমন দাবী ভুক্তভোক্তিদের মধ্যে আছাব উদ্দীন, ছালাহ উদ্দীনসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেরই। কাগজপত্র ঠিক থাকলেও পরিচ্ছন্নতাকর্মী  জসিমকে টাকা না দিলে ফাইল সহকারী কমিশনারের (ভূমি) টেবিলে পৌঁছায় না। কাগজপত্রে গরমিল থাকলে গুনতে হয় কয়েকগুণ বেশি টাকা। এই অফিসে সেবা নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির কথা জানান, খাইরুল আমিন, মাস্টার জসিম উদ্দীন, এইচএম ইব্রাহিম, হাফিজুর রহমান খান, অন্তর দেসহ অনেকেই।  

তাদের অভিযোগ- নামজারির আবেদন নিষ্পত্তিতে ফাইল প্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হয়। তারা জানায়- নামজারির আবেদনের সঙ্গে তাঁদের দিতে হয় বাড়তি ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। সর্বমোট একটি খতিয়ানের খরচ পড়ে ১৫-২০ হাজার টাকার অধিক।

শুধু গোরকঘাটা নয়, মাতারবাড়ি, কালারমার ছড়া, হোয়ানক, শাপলাপুরের ভূমি অফিসগুলোতেও রয়েছে একই চিত্র। ঘুষ ছাড়া সেবা মেলে না কোথাও। সেখানে পা বাড়ালে জমির মালিকদের জন্য পদে পদে অপেক্ষা করে হয়রানি। এ জন্য অনেকে ভূমি অফিস এড়িয়ে চলতে চান। জরুরি প্রয়োজনে দালালেরাই হয়ে ওঠেন সমাধান। গ্রাম এলাকায় জমির কাগজসংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা সমাধানে প্রথমেই যেতে হয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। পরের ধাপে সেবা দেয় উপজেলা ভূমি অফিস। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন এসব অফিসের দেওয়া সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে-
ভূমিহীনদের মাঝে কৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত, খতিয়ানের ভুল সংশোধন, নামজারি ও জমাভাগ, ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণীর আপত্তি—নিষ্পত্তি, দেওয়ানি আদালতের রায় বা আদেশমূলে রেকর্ড সংশোধন, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের আবেদন নিষ্পত্তি, জমা একত্রকরণ ও বিবিধ কেসের আদেশের নকল বা সার্টিফায়েড কপি প্রদান ইত্যাদি।

এসব সেবা নিতে জমির মালিকদের অনেককেই দালালের দ্বারস্থ হতে হয় বলে স্বীকার করেছেন গোরকঘাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি অফিসের স্টাফরা। কিছু ভূমির মালিক নামজারি করতে দালালদের দায়িত্ব দেন।

জানা গেছে- সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে দালালেরা যে টাকা নেন, তা ভাগ—বাঁটোয়ারাও হয় নানা ধাপে। উপজেলা ভূমি অফিসে তৎপর অনেক দালাল জানান- ঘুষের টাকা কানুনগো, তহশীলদার, সার্ভেয়ার ও নামজারি সহকারীকে দিয়ে কিছু অংশ পাই আমরা। বড় কর্মকর্তার নামেও যায় ভাগ।

ভূমি অফিসে গিয়ে জসিমের সাথে সরাসরি কথা বললে তিনি জানান- তিনি পেশায় পরিচ্ছন্নতা কর্মী হলেও সেটির কাজ স্বল্প সময়ে শেষ হয়ে যায়। তাই দিনের বেশীর ভাগ সময় অফিসে কাজের চাপ থাকায় নিজেও কম্পিউটার কাজ পারায় কম্পিউটারের অফিসিয়াল কাজগুলো করে দিয়ে সহযোগিতা করি। গোরকঘাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আরো ৩ জন অস্থায়ী কম্পিউটার অপারেটর থাকার কথাও তিনি জানান। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জানান- সমস্ত অভিযোগ মিথ্যা, আমি স্থানীয় লোক হয়ে সেবা প্রার্থীরা যাতে দ্রুত সেবা পায় সে ব্যাবস্থা করে থাকি, কাউকেই হয়রানী করি না। পাবলিক খুশি হয়ে যা দেয় তাই নিই। কিছু কুচক্রী মহল সুবিধা করতে না পেরে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে ভুল তথ্য দিচ্ছে।

উল্লেখ্য যে, তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি), বর্তমানে জেলা প্রশাসক (সাবির্ক), মহেশখালী থাকাকালীন ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত রাখতে দালালদের চিহ্নিত করে ভূমি অফিসের সামনে একটি তালিকা টাঙিয়ে রেখেছিলেন। ফলে অনেকটা দালালমুক্ত ছিল ভূমি অফিস । সে সময়ে যা সর্বমহলে প্রশংসা পায়। কিন্তু তার পদোন্নতি জনিত বদলীর কারণে চলে চাওয়ার পর থেকে ক্রমান্বয়ে একই চিত্র ফিরে আসে যা আজও দৃশ্যমান।

এদিকে ভূমি অফিসের চাকরি থেকে অবসরে যাওয়া সুধাংশু বিকাশ বিগত ৪ বছরের অধিক সময় ধরে এখনও অফিসে আছেন। অভিযোগ রয়েছে- অফিসের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজের দেখাশুনা করেন রীতিমতো। অদ্যবদি পর্যন্ত মোহাম্মদ জসিম ও সুধাংশু বিকাশদের মাধ্যমে রেকর্ড রুমের নিয়ন্ত্রন বিদ্যমান রয়েছে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তাছবীর হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন- সরাসরি মিডিয়ায় বক্তব্য দিতে আমার উর্ধ্বতন কর্মকতার্দের পারমিশনের প্রয়োজন আছে। তবে আপনাদেরকে আন—অফিসিয়ালি বলে রাখি, আপনাদের অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে শোনে নোট করেছি। আমি নতুন এসেছি, মাত্র ২মাস হলো।  আমার অফিসের সেবা যাতে সকলের জন্য সহজ হয় সে লক্ষ্যে কাজ করছি।  আমার তরফ হতে সর্বোচ্চ নাগরিক সেবা প্রদান করে থাকি। ভুক্তভোক্তিদের লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিব। তাছাড়াও  ভূমি অফিস দালালমুক্ত করতে সরকারের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা আছে। আমার দরজা সেবা গ্রহীতাদের জন্য সব সময় উন্মুক্ত। সেবা গ্রহীতারা যদি নিজেরা দালালদের মাধ্যমে না এসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আসলে আমি সবোর্চ্চ সেবা দিতে প্রস্তুত আছি। এছাড়াও অনলাইনে খাজনা পরিশোধের যে সুযোগ রয়েছে এই বিষয়ে সেবাগ্রহীতারা যদি সচেতন হয় তাহলে ভূমি অফিসে যেতে হবে না এবং ভোগান্তি কমে আসবে। জসিম দীর্ঘদিন এই অফিসে অস্থায়ী ভাবে কাজ করছে। তার ব্যাপারে খোঁজখবর নিবো। যদি তার দ্বারা অফিসের নিয়ম বর্হিভুত অনৈতিক কাজ হয়ে থাকে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে তথ্য বলছে- এ অফিসে সরকারি নথির নিরাপত্তা নেই, অফিসের কর্মচারিদের বাইরেও এ অফিসে চাকরি করে গেছেন এমন লোকজন এখানে কাজ করে যাচ্ছেন অদৃশ্য কারণে। একই সাথে দালাল সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রতিনিয়ত অফিসের ফাইৱ ঘাটাঘাটি করতে দেখা যায়, হরহামেশক সরকারি ফাইল নিয়ে যায় অফিসের বাইরে। ভূমি সংক্রান্ত সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিসের এমন অবস্থা দুঃজনক বলে মনে করেন ওয়াকিবহাল মহল। তাছাড়া ভূমি অফিসের সামনের গোলঘরটি এখন দালালদের অঘোষিত দপ্তর হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে বলে অনেকের দাবি। এখানে পুটিবিলা, গোরকঘাটা, বড় মহেশখালী, কুতুবজোম ও ছোট মহেশখালীর বিভিন্ন দালালসহ সমগ্র মহেশখালীর দালালরা প্রতিনিয়ত সেবাগ্রহিতাদের সাথে দরকষাকষি করতে দেখা যায়। তাছাড়া ভূমি অফিসের বাইরে বিভিন্ন চায়ের দোকান ও ভাতের হোটেলগুলোতেও চলে একই কাণ্ড।

এ অবস্থায় ভূমি অফিসের এমন চিত্রের পরিবর্তন চায় মহেশখালীর সচেতন নাগরিকরা, বিগত সময়ের মতো দালালের তালিকা প্রকাশ পূর্বক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তারা।