মহেশখালীতর প্রচারিত অস্ত্রধারীর ছবিতে এআই ও ডিজিটাল কারসাজির একাধিক আলামত


ফ্যাক্টচেক ডেস্ক।।
আজ মহেশখালীকেন্দ্রিক একটি অনলাইন নিউজ পেজে অস্ত্র হাতে এক ব্যক্তির কয়েকটি ছবি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়। তবে ছবিগুলোর সত্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে শুরু থেকেই জনমনে নানা প্রশ্ন উঠছিল। সেই সংশয়ের সূত্র ধরেই অনুসন্ধান করে আমাদের ফ্যাক্টচেক টিম।

ছবিগুলোর পিক্সেল-বাই-পিক্সেল এবং ভিজ্যুয়াল বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য- প্রচারিত ছবিগুলো বাস্তব কোনো ক্যামেরায় ধারণ করা অপরিবর্তিত আলোকচিত্র নয়, বরং এতে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং আধুনিক ডিজিটাল কারসাজির অকাট্য আলামত।

​অনুসন্ধানী বিশ্লেষণে মূলত ৫টি বড় ধরণের প্রযুক্তিগত অসঙ্গতি ও কারসাজির প্রমাণ মিলেছে।

১. একই হাতের হুবহু পুনরাবৃত্তি (Pattern Replication Artifact): ছবির ডান পাশে প্রদর্শিত একাধিক রিভলভারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, অস্ত্র ধরে থাকা হাতের আকৃতি, আঙুলের নিখুঁত অবস্থান, কবজির কোণ এবং গ্রিপের ধরন প্রায় শতভাগ এক। বাস্তব ফটোগ্রাফির নিয়মানুযায়ী, একজন ব্যক্তি একাধিকবার অস্ত্র হাতে পোজ দিলেও প্রতিটি ফ্রেমে পেশীর টান বা হাতের অবস্থানে সামান্য হলেও তারতম্য ঘটে। কিন্তু এখানে একই হাত ও গ্রিপ যেন নিখুঁতভাবে ‘কপি-পেস্ট’ করা হয়েছে। ডিজিটাল ফরেনসিক পরিভাষায় একে বলা হয় 'অ্যাসেট ডুপ্লিকেশন', যা জেনারেটিভ এআই বা এআই-সহায়তায় করা এডিটিংয়ের অন্যতম বড় লক্ষণ।

২. অবজেক্ট ক্লোনিং সিগনেচার: ছবিতে অস্ত্রের বিভিন্ন অংশে অস্বাভাবিক পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা গেছে। কয়েকটি রিভলভারের সিলিন্ডার, ট্রিগার গার্ড এবং গ্রিপের গঠনশৈলী অবিকল এক। বাস্তব ক্যামেরায় তোলা পৃথক ছবিতে আলোর কোণ বা দূরত্বের কারণে এই উপাদানগুলোতে সামান্য ভিন্নতা আসার কথা থাকলেও, এখানে স্পষ্ট ‘ডিজিটাল ক্লোনিং’ বা অবজেক্ট রেপ্লিকেশনের প্রমাণ মিলেছে।

৩. কাঠামোগত অসঙ্গতি (Geometric Distortion): অস্ত্রগুলোর ব্যারেল, সিলিন্ডার এবং ফ্রেমের ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিক অনুপাত বাস্তব অস্ত্রের প্রকৌশলগত কাঠামোর সাথে মিলছে না। কিছু জায়গায় মেটাল বা লোহা অবাস্তবভাবে বাঁকা ও অসমঞ্জস মনে হচ্ছে। এটি বর্তমান জেনারেটিভ এআই মডেলগুলোর একটি পরিচিত সীমাবদ্ধতা; এআই অনেক সময় বাস্তব অস্ত্রের নিখুঁত মেকানিক্যাল ডিজাইন হুবহু ফুটিয়ে তুলতে পারে না।

৪. আলো ও ছায়ার অসঙ্গতি (Lighting Inconsistency): ছবিটির আরেকটি বড় দুর্বলতা এর আলোকসম্পাত বা লাইটিং। একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে ছবি তুললে আলো ও ছায়া প্রকৃতির ভৌত নিয়ম মেনে একদিক থেকেই প্রতিফলিত হয়। কিন্তু এই ছবিতে অস্ত্রের একেক অংশে আলোর উৎস যেন ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে এসেছে বলে মনে হয়, যা 'ইমেজ কম্পোজিটিং' বা একাধিক ছবি কেটে জোড়া লাগানোর (কাট-পেস্ট) দিকেই ইঙ্গিত করে।

​অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় মোচড়টি আসে যখন একই ব্যক্তি, একই পোশাক এবং একই লোকেশনে ধারণ করা দুটি ছবির অস্ত্রের তুলনা করা হয়। দৃশ্যত একই মুহূর্তের ছবি দাবি করা হলেও, একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত পুরোনো ও মরিচাধরা ধাতব রঙের রিভলভার, অথচ অপর ছবিতে রহস্যজনকভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন নকশার আধুনিক কালো রঙের রিভলভার! একই সিকোয়েন্সের ছবিতে ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু অস্ত্রের মৌলিক কাঠামো ও রং এভাবে বদলে যাওয়া বাস্তব পৃথিবীতে অসম্ভব।

অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত: ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ স্পষ্ট জানান দিচ্ছে, মহেশখালীর এই অস্ত্রধারীর ছবিটিকে শতভাগ সত্য বা বাস্তব ঘটনার অপরিবর্তিত দলিল হিসেবে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। এটি এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার কিংবা আধুনিক এডিটিং টুলের মাধ্যমে তৈরি একটি বিভ্রান্তিকর ‘ডিজিটাল কম্পোজিট’।

​প্রযুক্তির এই যুগে যেকোনো চাঞ্চল্যকর ছবি বা তথ্য যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এই ঘটনাটি তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ। সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্পর্শকাতর বিষয়ে গণমাধ্যম এবং সাধারণ পাঠক- উভয়েরই এখন যেকোনো ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট প্রকাশের আগে সর্বোচ্চ প্রযুক্তিগত সতর্কতা ও যাচাই প্রক্রিয়া অবলম্বন করা জরুরি।