আমরা মহেশখালীর কথা বলি..

অপরাধ ও সামাজিক দায় - মহেশখালীর সব খবর

অপরাধ ও সামাজিক দায়

মুহম্মদ হেলাল উদ্দিন

'দুই শিশুকে হত্যার পর পিতা/মায়ের আত্মহত্যা', 'পিতা-মাতা ও ভাইকে হত্যা করল সন্তান', 'নিজ মেয়েকে ধর্ষণ করল পাষণ্ড পিতা', 'স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন', ‘দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত-৩’, ‘তরুণীর লাশ উদ্ধার’ ‘দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত-২’, 'তরুনীকে ধর্ষণের পর হত্যা করল তারই বন্ধু', এরকম আরো অনেক হত্যা, খুন, নির্যাতন, সংঘর্ষের সংবাদ শিরোনাম হয় গণমাধ্যমে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এরকম অসংখ্য ঘটনা-দুর্ঘটনা তথা অপরাধের সাথে যুক্ত হচ্ছে ক্রমবর্ধমান সামাজিক সংঘাত। আমার ধারণা, এটি বৈশ্বিক সমস্যা।

কিন্তু কেনো এ নির্মমতা, নৃশংসতা, অপরাধ ও পাশবিকতা? এরশাদ শিকদারের কাহিনী শুনেছি। এরপর বুড়িগঙ্গা পাড়ের আলম, সুইডেন আসলাম আর নিকট অতীতে সিরিয়াল কিলার রসু খাঁসহ আরো কতো ভীতিকর নাম।


অপরাধবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, প্রযুক্তির প্রসারের ফলেই ঘটছে এসব ঘটনা। কিন্তু কেনো বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা, কেনই বা মূল্যবোধের অবক্ষয়? এসব থেকে পরিত্রাণের উপায়ই বা-কি? যদ্দিন পর্যন্ত এসব প্রশ্নের সুরাহা না হবে ততোদিন এ সমস্যার মূলোৎপাটনও হবে না। রোগ নির্নয় করতে না পারলে নিরাময় অবশ্যই সম্ভব হবে না।
 

অপরাধ একটি চলমান প্রক্রিয়া, সমাজ যতদিন টিকে থাকবে অপরাধও ততদিন বহাল তবিয়তেই থাকবে। তথাপি অপরাধকে প্রতিরোধ করার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে সকলকে অবহিত করে সম্মিলিতভাবে অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যেতে হবে। কেননা, অপরাধ প্রতিকার করার নিমিত্তে যতই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক না কেনো অপরাধ কখনোই নির্মূল হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত অপরাধ প্রতিরোধের মর্মে সমাজকে একীভূত করা সম্ভব না হয়। তথাপি, অপরাধ সংঘটনের কারণকে উদঘাটিত করা সম্ভব হলে অপরাধ প্রতিকার করা সম্ভব হতে পারে। সে মর্মে অপরাধের কারণ বিশ্লেষণ করা জরুরী হয়ে পড়েছে।
 

“জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভাল” কবি যথার্থই বলেছেন, জন্মের সাথে অপরাধের কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না। একজন সাধারণের ঘরে জন্মগ্রহণ করে তার কর্মের গুণে অসাধারণ খ্যাতি লাভ করতে পারে। ঠিক তেমনিভাবে একজন বিখ্যাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে কর্মের গুণে সাধারণের কাতারে নেমে আসতে পারে। তবে সাধারণভাবে প্রচলিত দৃষ্টিতে দেখা যায়, নির্দিষ্ট সামাজিক পরিবেশে জন্মগ্রহণ করা ছেলেমেয়েদের অপরাধী হিশেবে দেখা হয়ে থাকে যা তাদেরকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত ধারণা, উঁচু ঘরের ছেলেমেয়েরা অপরাধের সাথে জড়িত হয় কম। অন্যদিকে প্রায় সব রাষ্ট্রেই দেখা যায়, উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত অনেকেই কর্পোরেট ক্রাইম এবং হোয়াইট কালার ক্রাইম করেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। সুতরাং জন্মগত বা পেশাগত কারণে কাউকেই অপরাধী হিশেবে দোষী সাব্যস্ত করা সমীচীন হবে না, কেননা হয়তোবা রিপুর তাড়নায় অথবা অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে মানুষ অপরাধের সহিত জড়িত হয়ে থাকে।
 

অপরাধের কারণগুলোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করতে হলে কয়েকটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করতে হয়। যেমন- জৈবিক দৃষ্টিভঙ্গি, মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, ভৌগোলিক দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রাতিষ্ঠানিক এবং বহুমুখী উপাদানমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করে অপরাধের কারণ নির্ণয় করা হয়। জৈবিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি সুপ্রাচীন ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্বের দিক থেকে এটি প্রথম প্রয়াস। অপরাধ বিজ্ঞানী সিজার লোমব্রুসোর মতে, এ দৃষ্টিভঙ্গির মূল আলোচনার বিষয়বস্তু হলো- শারীরিক গড়নের উপর মানুষের আচরণ বহুলাংশে নির্ভরশীল এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের আচরণের ও পরিবর্তন হয় এবং শারীরিক গঠন অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। অর্থাৎ শারীরিক গঠন অপরাধ সংগঠনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। কিন্তু, বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ও উৎকর্ষতায় শারীরিক গঠনটি এখন আর অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিশেবে প্রায়শই কাজ করে না।
 

বিশেষ বিশেষ শারীরিক গঠন বিশেষ বিশেষ অপরাধের জন্য বিবেচিত হয়। লোমব্রুসোর মতে, নিরপরাধীর তুলনায় অপরাধীরা শারীরিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ, অস্বাভাবিক এবং কোনো না কোনোভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ। মুখমন্ডলের বিশেষ ধরনের গঠন ও বৈশিষ্ট্যের জন্য মানুষের অপরাধ প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। চোখ, চিবুক, নাক ও মুখমন্ডলের গঠনের অসামঞ্জস্যতার জন্য অনেকেই অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে থাকে। মস্তক, খুলির আকার, গঠন কাঠামো এবং বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে মানবচরিত্র নির্ধারিত হয়ে থাকে। অসামঞ্জস্য মুখমন্ডল, বৃহদাকার এবং অতিবিকশিত চোয়াল, ত্রুটিপূর্ণ চোখ, অস্বাভাবিক কানের আকৃতি, বক্রাকৃতির নাক, পশমি চুল, দীর্ঘ বাহু এবং অস্বাভাবিক মস্তক থাকলে অনেক সময় মানুষ অপরাধী হয়ে উঠে। তাছাড়া অনেকেই জন্মগত, অভ্যাসগত, বিচারবুদ্ধিহীন এবং আবেগের বশবর্তী হয়ে অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে।
 

মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ব্যক্তির অপরাধপ্রবণতার জন্য সামাজিকভাবে উদ্ভূত কিছু বিষয়ের উপাদানগুলোর উপর গুরুত্ব দিতে হয়। সামাজিক ভারসাম্য ভূলুণ্ঠিত হলে সমাজে অপরাধীর সংখ্যা বেড়ে যায়। সামাজিক কিছু কার্যকলাপের ভিত্তিতে মানুষের মন অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠে। এমন কিছু উপাদান হলো- ঈর্ষাপরায়ণতা, হীনমন্যতা, হতাশা, স্বার্থ এবং আদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং দুর্বল চিত্ত। যখন একই শ্রেণীর লোকদের মধ্যে সামাজিক ভারসাম্যহীনতার ভিত্তিতে সামাজিক শ্রেণীর উৎপত্তি হয়, ঠিক তখনই এক দল অন্য দল বা গ্রুপের উপর ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠে। একজন অন্যজনের যশ, প্রভাব, প্রতিপত্তি, প্রতিষ্ঠা, সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি দেখে পরশ্রীকাতর হয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সমাজে হানাহানি, ঝগড়া, ফ্যাসাদ এবং মাঝে মধ্যে বড় ধরনের অপরাধও সংঘটিত হয়ে থাকে। মানুষের দৈহিক ত্রুটি, অযোগ্যতা, অক্ষমতা ইত্যাদি অনেক সময় তার মনে ইনফেরিয়রিটি (হীনতা/মন্দতা) কমপ্লেক্স সৃষ্টি করে থাকে। এ ধরনের শারীরিক অযোগ্যতার কারণে ঐ ব্যক্তিটি সমাজে অন্যের দ্বারা বিদ্রুপের শিকার হয়, যে বিষয়টি তাকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে। কানা, বধির, কালা, বোবা, টেরা চোখ থাকা ইত্যাদি মানুষকে হীনমন্য করে তোলে। অন্যদিকে এ বিষয়গুলো থাকার কারণে অনেকই আশ-পাশের লোকজন দ্বারা অপমানিত এবং লাঞ্ছিত হয়ে থাকে এবং এর ফলে তারা লিপ্ত হয় অপকর্মে।
 

প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা, কাজকর্মে সফলতা না আসা, চাকুরিতে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বেকার থাকা, কোন বিশেষ লক্ষ্য অর্জনে নিষ্ঠা ও সততা এবং চেষ্টা সত্ত্বেও সাফল্য না আসা ইত্যাদি কারণে মানুষের মাঝে হতাশা গ্রাস করে। হতাশার ফলশ্রুতিতে হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তিরা ধূমপান, মদ্যপান, আত্মহত্যা এবং খুন খারাপি করে থাকে।
 

আবার সমাজে বাস করতে গিয়ে কয়েকটি উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সমাজ সমাজের প্রয়োজনেই নিয়ম কানুন তৈরি করে থাকে। পরবর্তীতে তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে গোষ্ঠীসমূহের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। তারই প্রেক্ষিতে নিজেদের চরিতার্থ অর্জনের জন্য এমন সব পন্থা অবলম্বন করে যা সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে থাকে এবং আদর্শগত দ্বন্দ্ব তৈরি করে। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ যেখানে সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজমান সেখানেই অন্তর্ঘাতী দ্বন্দ্ব দেখা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন কারণে আদর্শগত দ্বন্দ্ব দেখা যায়। এর ফলে সংগঠিত হয় সংঘাত, আর সংঘাত রূপ নেয় সহিংসতায়।
 

আবার অনেক সময় দেখা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আইনভঙ্গকারী জনতার মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের কারণে অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। ধর্ম এবং গোষ্ঠীগত কারণে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির উদাহরণ এখন অহরহ। ধর্মীয় মতবিরোধ, সামাজিক রেষারেষির কারণে এবং দ্বিপাক্ষিক মত-পার্থক্য, বর্ণ বৈষম্য এবং জাতিগত কারণের জন্যও অনেক সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। এ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে অনেক সময় রাজনৈতিক সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়, অনেক সময় যেটি জাতীয় এমনকি আন্তর্জাতিক সহিংসতায়ও রূপ নেয়। ধর্মীয় গোড়ামী, অজ্ঞতা আর জ্ঞানের অগভীরতার কারণে এমন সংঘাত হয় মর্মে অপরাধ বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
 

দুর্বল চিত্তের অধিকারী মানুষ সমাজে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে না। মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষেরা দুর্বল চিত্তের অধিকারী হয়। তাছাড়া অতিরিক্ত আবেগী এবং মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত মানুষেরা সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে অক্ষম। নিজেদের উপরে হীনমন্যতার ধরুন তারা অনেক সময় অপরাধের দিকে ধাবিত হয় এবং সমাজে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি সব ধরনের চেষ্টা চালায়। এটি প্রায় সময় তার অজ্ঞতার কারণে হয়। তারা মনে করে কেবল তারাই সঠিক। তারা অন্যের মতামত বা কর্মপদ্ধতি কোনোভাবেই গ্রহণ করতে রাজি থাকে না। এক্ষেত্রে তাদের সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখা সমাজের কর্তব্য, সমাজ থেকে তারা সেটি পায় না বলেই অবসাদে ভোগে তারা। এ থেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে অনেকেই। এখানে মানসিক বিকারগ্রস্থতা একটি বৃহৎ সূচক (ধরুন, একজন কোনো প্রয়োজন ছাড়াই অভ্যাসগতভাবে অহেতুক মিথ্যা কথা বলে-তিনি মানসিক বিকারগ্রস্থ)। উপরোক্ত আলোচনায় অপরাধের অসংখ্য কারণের মধ্যে মাত্র কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। যথাযথ গবেষণা করে অপরাধ সংঘটনের মৌলিক কারণগুলো উদঘাটিত করে তৎসাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করে অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। আর এর জন্য প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হলো অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। অবশ্যই প্রকৃত অপরাধীকে।
 

নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকার তথা রাষ্ট্রের-এ কথা সত্য। কিন্তু একেবারে ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। কোনো দেশেই এটি সম্ভব হয়নি। কিন্তু যা সম্ভব, তা হচ্ছে নাগরিক অধিকার খর্ব হলে বা নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধ হলে তার প্রতিকার করা। রাষ্ট্রের নাগরিক কোনো অপরাধের শিকার হলে তার বিচার করাই রাষ্ট্রের কাজ। রাষ্ট্র অবশ্যই এ দায়িত্বই পালন করে আসছে। রাষ্ট্র এটি কোনোভাবেই একা করতে পারে না। যদি অনুষঙ্গ যোগান না দিই। এই অনুষঙ্গ অনেক অংশীজনের অংশগ্রহণে পূর্ণতা পায়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনেক বৈচিত্রময়। অনেক সময় দেখেছি, ঘটনার সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু হতে। এতে ন্যায় বিচার তো হয়ই না, বরং অস্থিতিশীল ও অরাজক পরিবেশ তৈরী হয় প্রায় সময়। ফলে অপরাধ প্রবণতা হ্রাসের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। আমাদের সমাজে একাধিক হত্যা মামলায় দেখেছি, ঘটনায় জড়িত নয় এমন লোকদের অভিযুক্ত হতে হয়েছে। তাদের মাথা থেকে অভিযোগের বোঝা নামাতেই জীবন সায়াহ্ন চলে এসেছে। কিন্তু, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এ যন্ত্রণা ভুলতে পেরেছে কি? এই না পারা থেকেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয় অপরাধের ধারা। এটি আরো বেশি হিংসাত্মক ও নৃশংস হয়।
 

আবার, কেবল বিচার হলেই হয় না, বিচার হতে হয় দৃশ্যমান (justice should not only be done, but also seen to be done)। মানে, সমাজে বিচারের একটা ছায়া পড়তে হয়। এতে অপরাধীদের কাছে একটা বার্তা যায়। আবারো নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে হয়, গত ৩৫ বছরে বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা খুব কাছ থেকে দেখেছি। এসব হত্যা মামলার কোনটির সাজা হয়নি। এটির একটির জন্যও বিচার বিভাগের একবিন্দুও দায় নেই। কোনো মামলায় অনুষঙ্গ ছিল না। কিছু ক্ষেত্রে দেখেছি, বিচারক যেনো ঘটনার সময় ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন। কি ঝরঝরে পর্যবেক্ষণ! সাজা না হওয়ার এ দায় আমাদের সকলের, নাগরিক হিশেবে এটি আমাদের পাপ বললে বেশি বলা হবে না।  
 

'বিচার' শুধু বিচার বিভাগই করে না। বিচার বিভাগ ন্যায়বিচার কায়েমের একটি নিয়ামক প্রতিষ্ঠানমাত্র (চূড়ান্ত বলা যায়)। এর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আরো নানা অনুষঙ্গ, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেমন আছে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব, তার সমান্তরাল ভূমিকা আছে সামাজিক নাগরিকের। এসব বারো রকমের অনুষঙ্গ ও কার্যপদ্ধতির গোলকধাঁধা পেরিয়ে অপরাধ প্রতিরোধ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা একটু কঠিনই বৈকি। তবে, অসম্ভব নয়। ঠিক এই পথটিই আমাদের অতিক্রম করতে হবে।
দ্রুততার সাথে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নজিরও আমাদের কম নয়। আমরা দেখেছি শিশু রাজন হত্যার দ্রুত বিচার হয়েছে। ফেনীর নুসরত হত্যার বিচার হয়েছে। বরগুনার রিফাত, ঢাকার বিশ্বজিত হত্যার বিচার হয়েছে। এরকম নজির আছে অসংখ্য।  
 

অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার যে সংস্কৃতি, সেটির পথ চিরতরে রুদ্ধ করতে হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এই যে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা বিচার বিভাগের একার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব না। আমাদের অনেকের মধ্যে ধারণা আছে, মামলা হয়েছে এর পরেরটা রাষ্ট্র করবে। এটি শতভাগ সঠিক নয়। একবার দেখেছি, স্বামী হত্যা করেছে স্ত্রীকে। ছেলেরা মামলা করেছে চাচাদের বিরুদ্ধে। আইনগত বেশ জটিল পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বামীকেই (বাদির পিতা) আইনের আওতায় এনেছে, বাদি সন্তোষ্ট হবেন কিভাবে? এ মামলার বিচার কি হবে তা বলা বেশ মুশকিল। এরকম বিচিত্র অভিজ্ঞতা আছে। এজন্যই সবার দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে আগের তিমিরেই রয়ে যেতে বাধ্য সমাজ।
 

বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে সামাজিক যে অস্থিরতা বিরাজ করছে তাতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, অশান্তি, হানাহানি ও উন্মাদনা বাড়ছে। হতাশায় ডুবে যাচ্ছে মানুষ। হতাশা থেকেই ক্ষোভের সৃষ্টি। এই হতাশা ও ক্ষোভের কারণে তুচ্ছ ঘটনায় অনেক সময় খুনখারাবি পর্যন্ত হয়ে যায়। গণমাধ্যমে এরকম সংবাদ আমরা দেখি। দুই টাকার জন্য আমরা যাত্রীকে না হয় হেল্পারকেও খুন হতে দেখেছি। এখানে কেবল আইন প্রয়োগের কথা দাবি করে কতোটুকু কি করতে পারবেন?  
 

ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তি ও নৃশংসতার মাত্রা বৃদ্ধির লাগাম টানতে হবে। এ দায়িত্ব সকল নাগরিকের। সামাজিক ভারসাম্যহীনতা ও অস্থিরতা দূর করতে হবে। আস্থায় ফেরাতে হবে তরুন সমাজকে। তরুণ ও যুব সমাজ যাতে রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে সম্পৃক্ত হতে পারে, সেই সুযোগ ও বাতাবরণ সৃষ্টি করতে হবে। একাজে রাষ্ট্রের সাথে সাথে জনগণ তথা প্রত্যেক নাগরিককেও এগিয়ে আসতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.