বিশেষ প্রতিবেদক◾মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুরে বনভূমির দখল ও উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে এলাকা রণক্ষেত্র পরিণত হওয়ার পর এবার বন বিভাগ এবং স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় বিট কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেছে বন বিভাগ, অন্যদিকে বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ ও চাঁদাবাজির পাল্টা অভিযোগ এনে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, দুই পক্ষকে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের এক জরুরি বৈঠক চলছে।
সম্প্রতি উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ ও বনভূমি রক্ষা নিয়ে যখন নানা টানাপোড়েন চলছে, ঠিক তখনই শাপলাপুরের এই ঘটনা পুরো জেলায় নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বন বিভাগের মামলা: আসামি ১৫০ জন
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি বনভূমি অবৈধ দখলমুক্ত করতে এবং কর্তব্যকাজে বাধা প্রদানের অভিযোগে স্থানীয় অন্তত ১৭৫ জন বাসিন্দার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার এজাহারে ২৫ জনের নাম উল্লেখ করে ১০০ থেকে ১৫০জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। মহেশখালী থানায় মামলাটি হয়েছে।
বন কর্মকর্তাদের দাবি, শাপলাপুরের সংরক্ষিত বনাঞ্চল অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা চালাচ্ছিল একটি চক্র। সেখানে বাধা দিতে গেলে বন কর্মীদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়। সরকারি সম্পদ রক্ষা এবং বন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভাগটি।
এলাকাবাসীর পাল্টা প্রতিরোধ: বন বিভাগের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি
এদিকে বন বিভাগের এই মামলাকে সম্পূর্ণ 'হয়রানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে দাবি করছেন শাপলাপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, বন বিভাগের স্থানীয় কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বাগান ও বসতভিটার নামে লাখ লাখ টাকা ঘুষ ও চাঁদা আদায় করে আসছিলেন। অনেক সময়রচাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই উচ্ছেদের নামে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালানো হয়।
ঘুষ ও চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও এজাহার নিয়ে এবার খোদ বন বিভাগের বিরুদ্ধেই পাল্টা মামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন এলাকাবাসী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এই অনড় অবস্থানের কারণে শাপলাপুরে এখন কার্যত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে।
অচলাবস্থা নিরসনে প্রশাসনে জরুরি বৈঠক
বন বিভাগ ও এলাকাবাসীর এই মুখোমুখি অবস্থানের ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মহেশখালী উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছেন।
বর্তমানে দুই পক্ষের প্রতিনিধি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে একটি অবরুদ্ধ ও জরুরি বৈঠক চলছে। সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হলো- উভয় পক্ষের অভিযোগ খতিয়ে দেখে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান সূত্র বের করা, যাতে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো অবনতি না ঘটে।
উপকূলীয় বন নিয়ে ধারাবাহিক সংকট
মহেশখালীর সচেতন মহল মনে করছেন, শাপলাপুরের এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এর আগে সোনাদিয়া দ্বীপে বেজা ও বন বিভাগের সমন্বয়হীনতার সুযোগে যেভাবে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা প্যারাবন কেটে চিংড়ি ঘের ও লবণ মাঠ তৈরি করেছিল, শাপলাপুরেও সেই একই সিন্ডিকেটের কালো ছায়া দেখছেন অনেকে। তবে সোনাদিয়ায় বন রক্ষা নিয়ে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ থাকলেও, শাপলাপুরে বন বিভাগের মামলার পর স্থানীয়দের পাল্টা প্রতিরোধের ঘটনাটি প্রশাসনের জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
প্রশাসনের চলমান বৈঠক থেকে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত আসে এবং বনের জমি রক্ষা বনাম সাধারণ মানুষের অধিকারের এই লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
আপডেট: শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বৈঠক শেষ হয়েছে, নিরীহ মানুষকে আসামি করায় স্থানীয়দের প্রতিবাদে কর্মকর্তারা মামলা থেকে নিরীহ লোকদের বাদ দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।
