মহেশখালী উপকূল গিলে খাচ্ছে অবৈধ এক্সকাভেটর


বিশেষ প্রতিবেদক◾ মহেশখালীর বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে দিন-রাত দানবীয় এক্সকাভেটরের আঘাতে বদলে যাচ্ছে দ্বীপের ভূ-প্রাকৃতিক গঠন। যেসব ম্যানগ্রোভ বা প্যারাবন উপকূলীয় অঞ্চলকে দীর্ঘ বছর ধরে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করে আসছে, তা এখন ভারী এক্সকাভেটর বা খননযন্ত্রের নির্মম থাবায় নিমিষেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

একই সঙ্গে সরকারি শত শত একর খাসজমি ও খালের গতিপথ আটকে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে বেপরোয়াভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন নতুন অবৈধ চিংড়িঘের ও লবণের মাঠ। একসময় শ্রমিকের কোদাল দিয়ে হাতে ঘের বা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে সপ্তাহ বা মাসে যে সময় লাগত, এখন এক্সকাভেটরের ব্যবহারে মাত্র কয়েক ঘণ্টা কিংবা দু-এক দিনেই শত শত একর সরকারি প্যারাবন উজাড় করে বিশাল সীমানা বাঁধ তৈরি করে ফেলছে দখলদাররা।

মহেশখালীর গোরকঘাটা ও চরণদ্বীপ রেঞ্জের বিশাল ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলসহ উপকূলীয় কুতুবজোম, ঘটিভাঙ্গা, সোনাদিয়া, বড়দিয়া, শাপলাপুর, বদরখালী ও ধলঘাটা এলাকায় এই তৎপরতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

একসময়ের দীর্ঘস্থায়ী উচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বর্তমানে অবৈধ খননযন্ত্রের বাণিজ্যিক ব্যবহার দখলের অর্থনীতিকে বহুগুণ ত্বরান্বিত করেছে।

তথ্য বলছে, এক্সকাভেটর ব্যবসায়ীরা মাটি কাটার হিসাবের ওপর ভিত্তি করে একাধিক উপায়ে চুক্তি করছেন। তারা মাটির ঘনফুট, বাঁধের পুরুত্ব, উচ্চতা ও দৈর্ঘ্য মেপে অথবা সরাসরি দৈনিক হিসেবে ভারী এই যন্ত্র ভাড়া দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে জমির জঙ্গল পরিষ্কার, প্যারাবনের বাইন ও কেওড়া গাছের শিকড় উপড়ে ফেলা, খালের মুখ ভরাট করা এবং চারদিকে বিশাল উঁচু বাঁধ তৈরির মতো পুরো দখল কার্যক্রমই এককালীন বড় অঙ্কের টাকার চুক্তিতে সম্পন্ন করছে এই নেটওয়ার্ক। 

দিনের আলোতে কৌশলগত নীরবতা বজায় রাখলেও সন্ধ্যার পর ও ভাটার সময়ে প্রত্যন্ত প্যারাবন ও চরাঞ্চলে এসব ভারী যন্ত্র সচল করা হচ্ছে। ফলে প্রশাসনিক দল পৌঁছানোর আগেই রাতারাতি স্থায়ী রূপ পাচ্ছে নতুন নতুন অবৈধ ঘের।

কুতুবজোম ইউনিয়নের সার্বিক পরিবেশ ও সরকারি খাসজমি ধ্বংসে যেসব এক্সকাভেটর ব্যবসায়ী ও চক্রের নাম স্থানীয়দের মুখ থেকে উঠে আসছে, তাদের মধ্যে অন্যতম দৈলার পাড়ার ছৈয়দ কবির মেম্বার ও তার পুত্র সায়েদ সাফওয়ান সজীব, বুজুরুক পাড়ার আব্বাস মিয়া এবং কুতুবজোম নয়াপাড়ার নবাব মিয়া।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কুতুবজোমের বিভিন্ন মৌজায় সরকারি জলমহাল, প্যারাবন ও খাসজমি দখল করে ঘের নির্মাণের কাজে তাঁদের মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন হেভি এক্সকাভেটরগুলো দিন-রাত ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া অভিযোগ উঠেছে- বন বিভাগের কুতুবজোম ঘটিভাঙা বিটের বাগান প্রহরী মুস্তাফিজ মূলত বন বিভাগের অঘোষিত ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এসব এক্সকাভেটরের মালিকদের থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করে আসছিলেন। যার ফলে পুরো কুতুবজোমজুড়ে এমন একটি বেপরোয়া অবৈধ মাটি কাটা চক্র গড়ে ওঠে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ কিংবা আইনি নোটিশ দিলেও এই অবৈধ এক্সকাভেটর সিন্ডিকেটের কার্যক্রম একদিনের জন্যও থামেনি। উচ্ছেদ অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই ফেলে যাওয়া ভাঙা বাঁধে পুনরায় এক্সকাভেটর নামিয়ে রাতারাতি আবার সীমানা উঁচু করে ফেলা হচ্ছে। এতে উপকূলের জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য এবং হুমকির মুখে পড়ছে সামুদ্রিক কচ্ছপ ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছৈয়দ কবির মেম্বার জানান, তিনি ব্যবসা গুটিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন তিন মাস আগে এবং বর্তমানে এসব ব্যবসার সাথে তিনি যুক্ত নন বলে দাবি করেন।

অন্যদিকে আব্বাস মিয়া জানিয়েছেন, এখন তাঁর কোনো নিজস্ব এক্সকাভেটর নেই; তিনি মূলত ৬ মাসের জন্য এক্সকাভেটর ভাড়া এনেছিলেন এবং মেয়াদ শেষে তা ফেরত পাঠিয়েছেন। অভিযুক্ত অন্যদেরকে একাধিকবার ফোন করা হলেও কল রিসিভ না করায় তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে এসব এক্সকাভেটর ও ডাম্পট্রাকের একাধিক চালকের তথ্য ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র বলছে, এ চক্রটির মাটি কাটা ও বালি সরবরাহের অবৈধ ব্যবসা এখন সমনে চলছে। বর্তমানে জাইকার অর্থায়নে চলা কুতুবদিয়ার ঠিকাদারের কাজে বালি সরবরাহ দিচ্ছে চক্রটি।

বন বিভাগের অভিযুক্ত বাগান প্রহরী মোস্তাফিজের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে নিজের নাম অস্বীকার করে 'শাহাব উদ্দিন' বলে পরিচয় দেন। পরবর্তীতে নিজের প্রকৃত নাম স্বীকার করে তিনি দাবি করেন, বর্তমানে কুতুবজোমে এক্সকাভেটর চালানোর সুযোগ নেই। 'মহেশখালীর সব খবর'-এ সংবাদ প্রকাশের পর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এসব এক্সকাভেটর আটক করার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে তিনি জানান।

অবৈধ ঘের নির্মাণ ও সরকারি বনাঞ্চল রক্ষায় প্রশাসনের ধারাবাহিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম জানান, উপকূলীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ, সরকারি খাসজমি ও সংবেদনশীল প্যারাবন রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অবৈধভাবে এক্সকাভেটর চালিয়ে বা ম্যানুয়ালি সরকারি জমিতে নদী-খাল ভরাট ও প্যারাবন নিধন করে যারা ঘের নির্মাণের চেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে বেশ কিছু অবৈধ ঘের ও বাঁধ চিহ্নিত করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যেসব এক্সকাভেটর মালিক, চালক ও মূল দখলদার যুক্ত রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পরিবেশ আইন ও দণ্ডবিধিতে নিয়মিত মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে মহেশখালীর উপকূলকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে এখন আর কেবল সাময়িক ঘের উচ্ছেদ বা বাঁধ কেটে দেওয়া যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহল। তাঁদের মতে, দখলদারিত্বের অন্যতম চালিকাশক্তি এই অবৈধ এক্সকাভেটর বা হেভি ইকুইপমেন্টের ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। উপজেলার প্রতিটি এক্সকাভেটরের মালিকানা, চলাচলের অনুমতি ও চালকদের নিবন্ধন নিশ্চিত করা, ডিজিটাল স্যাটেলাইট চিত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে উপকূল পর্যবেক্ষণ করা এবং অবৈধ কাজে ব্যবহৃত যন্ত্র জব্দ করে মালিক ও চুক্তিভিত্তিক দখলদার উভয়কেই আইনের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় একের পর এক এক্সকাভেটরের গ্রাসে মহেশখালীর উপকূল থেকে ম্যানগ্রোভ বন চিরতরে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা উপকূলীয় মানুষের বাসস্থান ও নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।