মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫০ কোটি টাকার মালামাল পাচারের অভিযোগ: ঢাকা-স্থানীয় সিন্ডিকেটের যোগসাজশে হরিলুট, বিক্ষুব্ধ জনতা

বিশেষ প্রতিবেদক।। কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি ১২০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে কোনো প্রকাশ্য টেন্ডার, নিলাম বা বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই প্রায় ৫০ কোটি টাকার মালামাল পাচারের অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই কেপিআই (Key Point Installation) এলাকা থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঢাকাভিত্তিক শীর্ষ কর্মকর্তা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ এবং স্থানীয় একটি প্রভাবশালী দালাল চক্রের যোগসাজশে বেপরোয়াভাবে এসব মালামাল সরানো হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

নিয়ম অনুযায়ী, কেপিআই এলাকা থেকে কোনো সরকারি বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালামাল বিক্রি বা বাইরে নিতে হলে উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে নিলাম সম্পন্ন করা এবং বৈধ চালান ও গেটপাস থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, এই নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে থাকা মূল্যবান সরঞ্জামাদি কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই শুধু সিকিউরিটি টিম ও কর্মকর্তাদের 'ম্যানেজ' করে পাচার করা হচ্ছে।

# যা যা পাচার হচ্ছে:
আমাদের হাতে আসা সংশ্লিষ্ট একটি নথির বরাতে জানা গেছে, পাচার হওয়া বা পাচারের তালিকায় থাকা মালামালগুলোর মধ্যে রয়েছে বিলাসবহুল গাড়ি, উচ্চ ক্ষমতার জেনারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, মূল্যবান তামার তার ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, মেটাল স্ক্র্যাপ, স্টিল ড্রাম, পিভিসি পাইপ, কাঠ, কন্টেইনার টাইপ অ্যাকোমোডেশন, স্টিল ফার্নিচার, দরজা-জানালা, ফায়ার এক্সটিংগুইশারসহ প্রায় ১০০ ধরনের নির্মাণসামগ্রী ও সরঞ্জাম। তালিকাভুক্ত এসব স্ক্র্যাপ ও মালামালের মোট ওজন প্রায় ৪৬ হাজার ২১৩ টন। যার আনুমানিক মূল্য ৫০ কোটি টাকারও বেশি।


# সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কারা: 

স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরের কয়েকজন অসাধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মকর্তা এবং ঢাকা অফিসের একটি দুর্নীতিবাজ চক্র মিলে এই বিশাল সিন্ডিকেটটি গড়ে তুলেছে। আর মহেশখালী প্রান্তে মাঠপর্যায়ে এই মালামাল লোড করা, পরিবহন এবং পাহারার দালাল হিসেবে কাজ করছে স্থানীয় মামুন, আবছার, কপিল ও মোস্তফার নেতৃত্বাধীন একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

# ট্রাক ঢুকিয়ে পাচার ও স্থানীয়দের বিক্ষোভ:


প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, গত বুধবার (৪ নভেম্বর) ৩টি এবং বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আরও ৪টি বহিরাগত বড় ট্রাক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রবেশ করে লাখ লাখ টাকার মালামাল লোড করে নির্বিঘ্নে বের হয়ে যায়।

এরপর রবিবার (৮ নভেম্বর) আরও ১৫টি ট্রাক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঢুকিয়ে মালামাল পাচারের উদ্যোগ নেয় চক্রটি। প্রথম ধাপে ৩টি ট্রাক ভেতরে প্রবেশ করে মালামাল লোড করা শুরু করলে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে এবং দ্রুত এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

সরকারি মালামাল হরিলুটের এই খবর জানাজানি হলে রবিবার সন্ধ্যায় শত শত ক্ষুব্ধ জনতা বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ শুরু করেন। এ সময় তারা পাচার চক্রের বিচার ও মালামাল লুট বন্ধের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।

# কর্মকর্তাদের তড়িঘড়ি প্রস্থান:

বিক্ষোভকারীদের চাপে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি। আন্দোলনকারীরা জানান, স্থানীয় সচেতন মহলের পক্ষ থেকে ৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলতে এবং স্মারকলিপি দিতে চাইলেও তাদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কর্মকর্তাদের বহনকারী গাড়িগুলো মূল ফটক ব্যবহার না করে পেছনের ২ নম্বর গেট দিয়ে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যায়।

মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো। এর আগে এই প্রকল্প থেকে দফায় দফায় তামার তার ও নির্মাণসামগ্রী চুরির ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উঠে এসেছিল। তবে এবার সরাসরি শীর্ষ পর্যায় ও সিকিউরিটি টিমের যোগসাজশে বহিরাগত ট্রাক ঢুকিয়ে এতো বিশাল অঙ্কের সরকারি সম্পদ পাচারের চেষ্টায় পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের জোরালো দাবি, অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নৌবাহিনী ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে এই ৫০ কোটি টাকার পাচার সিন্ডিকেটের গভীরে অনুসন্ধান করে মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

রিপোর্ট: মাহবুব রোকন //