এসএটি-তে বিশ্বসেরা ১ শতাংশের তালিকায় মহেশখালীর নির্বান: হাতছানি দিচ্ছে অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজ

 

ফারুক ইকবাল।। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘স্কলাস্টিক অ্যাসেসমেন্ট টেস্ট’ (এসএটি) পরীক্ষায় অভাবনীয় ফলাফল অর্জন করেছেন মহেশখালী পৌরসভার গর্বিত সন্তান নির্বান বিন শাহজাহান।

কক্সবাজারের সাগরদ্বীপ মহেশখালীর উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ ছাপিয়ে আজ বিশ্বমঞ্চে অনুরণিত হচ্ছে এক তরুণ মেধাবীর নাম- নির্বান বিন শাহজাহান। নিজের প্রখর মেধা আর অদম্য অধ্যাবসায় দিয়ে বিশ্বের সেরা ১ শতাংশ মেধাবীর তালিকায় স্থান করে নেওয়া যে সম্ভব, নির্বান তার এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ‘স্কলাস্টিক অ্যাসেসমেন্ট টেস্ট’ (সংক্ষেপে এসএটি) পরীক্ষায় ১৬০০ নম্বরের মধ্যে ১৫২০ নম্বর অর্জন করে তিনি শুধু মহেশখালী নয়, পুরো বাংলাদেশের মানচিত্রকে বিশ্ব দরবারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

নির্বানের এই সাফল্যের রাজমুকুট হলো এসএটির গণিত অংশে ৮০০ নম্বরের মধ্যে পূর্ণ ৮০০ নম্বর পাওয়া, যা তার গাণিতিক যুক্তি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার বিশ্বমানের দক্ষতা প্রমাণ করে। পাশাপাশি ইংরেজি (পড়া ও লেখা) অংশে ৭২০ নম্বর পেয়ে তিনি নিজের বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। এই অভাবনীয় ফলাফলের ভিত্তিতে তিনি বর্তমানে অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ ও আইভি লিগভুক্ত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পূর্ণ স্কলারশিপসহ উচ্চশিক্ষার এক সোনালী দুয়ার উন্মোচন করেছেন।

নির্বান বিন শাহজাহান মহেশখালী পৌরসভার শল'র গোষ্ঠীর এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও বিদ্যানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মো. শাহজাহান এবং শকুন্তলা খান দম্পতির জ্যেষ্ঠ সন্তান। তার পারিবারিক শেকড় ও ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ; তিনি মরহুম মোজাহের মিয়ার পৌত্র এবং প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ড. সলিমুল্লাহ খান ও মরহুম অধ্যাপক আমান উল্লাহ খানের নাতি। মেধাবী এই পরিবারের জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের মশাল এখন নির্বানের হাতে, যা তিনি বিশ্বমঞ্চে সগৌরবে বহন করছেন। নির্বানের এই প্রতিভা কেবল ক্লাসরুমের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বর্তমানে দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ নটর ডেম কলেজের ২০২৬ ব্যাচের এই শিক্ষার্থী তার অর্জনের ঝুলিতে ভরেছেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পদক ও বিরল সম্মাননা। 

তিনি ২৯তম আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমি অলিম্পিয়াডের ন্যাশনাল উইনার, বাংলাদেশ স্পেস অলিম্পিয়াডের সিনিয়র ক্যাটাগরিতে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন এবং ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স কম্পিটিশনে গোল্ড অ্যাওয়ার্ড পেয়ে বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশ মেধাবীর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। 

কেবল বিজ্ঞান নয়, গাণিতিক অলিম্পিয়াডেও তার সাফল্য ঈর্ষণীয়; তিনি ইন্টারন্যাশনাল ইউথ ম্যাথ চ্যালেঞ্জে সিলভার অ্যাওয়ার্ড পেয়ে বিশ্বের শীর্ষ ৮ শতাংশের মধ্যে স্থান পেয়েছেন। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি ও আর্থ অলিম্পিয়াডে তিনি বারবার বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। এছাড়াও তিনি মর্যাদাপূর্ণ ডিউক অফ এডিনবার্গের গোল্ড অ্যাওয়ার্ড এবং কুইন্স কমনওয়েলথ এসসে কম্পিটিশনে ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেছেন।

‘বিমলাইন ফর স্কুলস’ প্রতিযোগিতায় আউটরিচ অ্যাওয়ার্ড এবং ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট অলিম্পিয়াডে বিভাগীয় বিজয়ী হওয়া তার বহুমুখী সৃজনশীলতারই পরিচয় দেয়।

একাডেমিক ক্ষেত্রেও নির্বানের রেকর্ড সমানভাবে উজ্জ্বল। পিএসসি, জেএসসি এবং এসএসসিতে গোল্ডেন এ-প্লাস ও বৃত্তিসহ অসাধারণ ফলাফল করা নির্বান এখন ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিজ্ঞানমনস্ক এই তরুণের স্বপ্ন মহাকাশবিজ্ঞান বা উচ্চতর পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে বিশ্বমানের গবেষণা করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করা। 

মহেশখালীর দুর্গম জনপদ থেকে উঠে এসে বিশ্বজয়ের এই মহাকাব্য আজ প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। তার এই জয়যাত্রা প্রমাণ করে যে, সঠিক লক্ষ্য আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে প্রান্তিক অঞ্চল থেকেও বিশ্বজয়ী প্রতিভা গড়ে ওঠা সম্ভব। নির্বান বিন শাহজাহানের এই অনন্য অর্জনে তার পরিবার, শিক্ষক এবং পুরো মহেশখালীবাসী আজ গর্বিত ও আনন্দিত। সকলের প্রত্যাশা, নির্বান তার মেধা দিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা আরও উঁচুতে তুলে ধরবেন।

প্রসঙ্গত: এসএটি (SAT) যার পূর্ণরূপ হলো ‘স্কলাস্টিক অ্যাসেসমেন্ট টেস্ট’, এটি মূলত একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ডমূলক পরীক্ষা যা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্নাতক বা ব্যাচেলর পর্যায়ে ভর্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। আমেরিকার অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘কলেজ বোর্ড’ দ্বারা পরিচালিত এই পরীক্ষাটি মূলত একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার উপযোগী একাডেমিক দক্ষতা এবং গাণিতিক ও ভাষাগত সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি প্রধান মাধ্যম। পরীক্ষাটি মোট ১৬০০ নম্বরের ওপর অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে গণিত অংশে ৮০০ এবং ইংরেজি (রিডিং অ্যান্ড রাইটিং) অংশে ৮০০ নম্বর বরাদ্দ থাকে। বিশ্বব্যাপী হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড কিংবা ক্যামব্রিজের মতো মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে এই পরীক্ষার স্কোর একটি অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে ভালো এসএটি স্কোর থাকলে শিক্ষার্থীরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলোতে বিশাল অংকের স্কলারশিপ বা বিনা খরচে উচ্চশিক্ষার এক অনন্য সুযোগ লাভ করতে পারে। প্রতি বছর বিশ্বের লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থী এই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং এর মাধ্যমেই তাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও গাণিতিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় ফুটে ওঠে, যা আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার আঙিনায় প্রবেশের এক শক্তিশালী চাবিকাঠি হিসেবে স্বীকৃত।