মাতারবাড়িতে মেগা প্রকল্পের অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জনরোষ; কর্মসংস্থান ও ন্যায্য পাওনার দাবিতে উত্তাল জনপদ


দাবি মানা না হলে মাতারবাড়ির প্রতিটি প্রবেশপথে কঠোর অবরোধ গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি
এম.এ.কে. রানা, মাতারবাড়ি থেকে ।। দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প মাতারবাড়ি কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের বঞ্চনা, নিয়োগ বাণিজ্য এবং অসাধু কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে মহেশখালীর সাধারণ মানুষ। কর্মহারা স্থানীয়দের অবিলম্বে চাকরি প্রদান, ২১ ক্যাটাগরির প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রাণনাশের হুমকিদাতা সিজিডিসিএল-এর বিতর্কিত কর্মকর্তা মিজানসহ দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে মঙ্গলবার (১৯ মে) এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

বিকেল ৩টায় মাতারবাড়ি সাইরার ডেইল ২ নম্বর গেট সংলগ্ন এলাকায় আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বিপুল মানুষের সমাগম ঘটে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ কয়েকশ’ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো এলাকা ‘অধিকার আদায়ের’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে।

বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, দেশের এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মাতারবাড়ির মানুষ নিজেদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি, কৃষিজমি এবং লবণের মাঠ বিসর্জন দিয়ে আজ নিঃস্ব। অথচ প্রকল্প চালু হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, স্থানীয় শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণরা নিয়োগের ক্ষেত্রে অবহেলিত। কোলপাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা বহিরাগতদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, যারা টাকার বিনিময়ে নিয়োগ বাণিজ্য ও ব্যবসায়িক একাধিপত্য বজায় রাখছে। স্থানীয়দের বাদ দিয়ে বহিরাগতদের সুযোগ করে দেওয়ার এই নোংরা প্রক্রিয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। বক্তারা অবিলম্বে এই অশুভ সিন্ডিকেটের মূলহোতা মিজানসহ সংশ্লিষ্ট দুর্নীতিবাজদের অপসারণের দাবি জানান।

মাতারবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ফিরোজ আহমেদ এবং ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক রফিক উদ্দিন মানিক তাঁদের বক্তব্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, উন্নয়নের নামে স্থানীয়দের উদ্বাস্তু ও কর্মহীন করে রাখা একটি চরম অমানবিক কাজ। যে মানুষগুলো সবকিছু বিসর্জন দিল, আজ তাদেরই অধিকারের জন্য রাজপথে দাঁড়াতে হচ্ছে- এটি বড়ই আক্ষেপের। 

মাতারবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাস্টার শাখাওয়াত হোছাইন এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক নাজেম উদ্দিন অভিযোগ করেন যে, এই দুর্নীতিবাজ চক্রটি শুধু সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করছে না, বরং প্রতিবাদ করায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। তাঁরা সাফ জানিয়ে দেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব অনিয়ম বন্ধ করে স্থানীয়দের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে মাতারবাড়ির প্রতিটি প্রবেশপথে কঠোর অবরোধ গড়ে তোলা হবে।

সংবাদকর্মী ও স্থানীয় সচেতন মহলের পক্ষ থেকে এস এম রুবেল বলেন, মাতারবাড়ির মানুষ বছরের পর বছর ধৈর্য ধরেছে কিন্তু বঞ্চনার মাত্রা এখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। সমাবেশে মাওলানা মোহাম্মদ মহসিন, যুবদল নেতা মহিবুল করিম, শ্রমিকদলের আরমান উল্লাহ আরমান এবং মৎস্যজীবী দলের নেছারুল হকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন। 

বক্তারা একযোগে দাবি করেন, প্রকল্পের সুফল স্থানীয়দের ঘরে না পৌঁছালে এই উন্নয়ন অর্থহীন। তাঁরা অবিলম্বে সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং ঘোষণা দেন যে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন আরও বৃহত্তর রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়বে।