জানা গেছে, ধলঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহসান উল্লাহ বাচ্চু ২০২৪ সালের আগস্টে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্ত হলেও বর্তমানে তিনি বিভিন্ন মামলার কারণে এলাকায় অনুপস্থিত।
স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকলেও ধলঘাটায় চলছে তার উল্টো। অভিযোগ উঠেছে, উত্তর সুতরিয়া এলাকার জালাল উদ্দীনের পুত্র ও ছাত্রলীগ রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত মঈন উদ্দিন নিজেকে অঘোষিত ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে জাহির করে পরিষদের যাবতীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি নিয়মিত চেয়ারম্যান বাচ্চুর স্বাক্ষর ও সিল জাল করে বিভিন্ন নির্দেশনামা জারি করছেন।
জালিয়াতির এই ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ্যে আসে যখন ধলঘাটার মিলঘোনা চিংড়ি প্রকল্পের বৈধ জমি মালিকদের নামে একটি বিতর্কিত নোটিশ ইস্যু করা হয়। গত কয়েকদিন ধরে মালিকরা যখন তাদের ঘেরে পোনা ছাড়া ও সংস্কার কাজ শুরু করেছেন, ঠিক তখনই মঈন উদ্দিন স্বাক্ষরিত (চেয়ারম্যানের নকল স্বাক্ষর) একটি নোটিশে ঘেরের কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।ভুক্তভোগী জমি মালিকদের দাবি, ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে চাষাবাদ বন্ধের কোনো আইনি এখতিয়ার ইউনিয়ন পরিষদের নেই। মূলত একটি প্রভাবশালী চক্রকে অবৈধভাবে ঘের জবরদখল করার সুযোগ করে দিতেই এই ভুয়া ও বিধিবহির্ভূত নোটিশের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
এই প্রশাসনিক জালিয়াতির নেপথ্যে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক সমীকরণ দেখছে স্থানীয়রা। স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নেতা বাচ্চু চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ অনুসারী মঈন উদ্দিনকে নেপথ্যে থেকে মদদ দিচ্ছেন ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ও ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি নুরুল ইসলাম বাশি। আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও চিংড়ি ঘের নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক স্বার্থের প্রশ্নে তারা একাট্টা হয়ে ইউনিয়ন পরিষদকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছেন। মঈন উদ্দিন পরিষদের কোনো বৈধ কর্মী বা প্রতিনিধি না হওয়া সত্ত্বেও বাশি মেম্বারের প্রত্যক্ষ প্রভাবে তিনি দাপ্তরিক ফাইল নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
বিভিন্ন নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চেয়ারম্যান বাচ্চুর মূল স্বাক্ষরের সাথে বর্তমানে ইস্যুকৃত নোটিশের স্বাক্ষরের কোনো মিল নেই। আইনজীবীদের মতে, দাপ্তরিক প্যাড ও সিল ব্যবহার করে স্বাক্ষর জাল করা দণ্ডবিধির ৪৬৩, ৪৬৪ ও ৪৬৮ ধারা অনুযায়ী একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। শুধু তাই নয়, নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই মঈন উদ্দিন একটি মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। একজন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি কীভাবে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দিনের পর দিন ইউনিয়ন পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।ধলঘাটার সাধারণ মানুষের প্রশ্ন- চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে কীভাবে দাপ্তরিক কার্যক্রম একজন বহিরাগত ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করছেন? প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার বিভাগের নজরদারি এড়িয়ে কীভাবে এই ‘স্বাক্ষর জালিয়াতি সিন্ডিকেট’ সক্রিয় রয়েছে? সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিশ্বস্ততা ধূলিসাৎ হবে এবং সাধারণ মানুষের সম্পত্তির অধিকার ভূলুণ্ঠিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এই জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ফরেনসিক তদন্ত এবং প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন মিলঘোনা চিংড়ি প্রকল্পের ভুক্তভোগী জমি মালিকরা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে অভিযুক্ত মঈন উদ্দিন ও ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম বাশিরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা হুবহু প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।


